বাংলাদেশের সরকার সম্প্রতি “প্রপার্টি, প্ল্যান্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট (PPE) ও লিজ ম্যানুয়াল” প্রকাশ করে সরকারি সম্পদের তদারকি বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। আর্থিক বিভাগ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা এখন ৬.৩৯ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি, যার বেশিরভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা (SOE) এবং অনিয়ন্ত্রিত লিজ চুক্তি থেকে উদ্ভূত। এসব লিজ চুক্তি প্রায়শই বাজেটের আওতায় না থেকে আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। নতুন ম্যানুয়ালটি দীর্ঘমেয়াদী দায় কমাতে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ করতে নকশা করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে, আর্থিক বিভাগের অধীনে SPFMS প্রোগ্রাম দুই দিনের “SOEs এবং ABs গভার্নেন্স: অগ্রগতি পর্যালোচনা ও পথচলা” শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করে, যা আজ কক্সবাজারে সমাপ্ত হয়েছে। কর্মশালায় বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তার অংশগ্রহণে নীতি নির্ধারণের দিকনির্দেশনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা আলোচনা করা হয়। কর্মশালার সমাপ্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ম্যানুয়ালের মূল দিকগুলো উপস্থাপন করা হয়।
কর্মশালার উদ্বোধনী সেশনে অতিরিক্ত সেক্রেটারি (বাজেট ও ম্যাক্রোইকোনমিক্স) মো. হাসানুল মতিন উল্লেখ করেন, বেশ কয়েকটি SOE-র অদক্ষ পরিচালনা এবং একাধিক সংস্থার ক্ষমতার অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মানের শাসন পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি। ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, রাজস্ব হ্রাস পাচ্ছে—এই দুইটি বিষয় সমগ্র সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সমাধান করা কঠিন। তাই তিনি “সার্বিক-সরকারি” পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন।
আর্থিক বিভাগের সমীক্ষা অনুসারে, ১৪টি “অত্যন্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ” সংস্থা দেশের মোট জিডিপির ৩.১৩ শতাংশ সমান দায় বহন করে, আর অতিরিক্ত ২৮টি “উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ” সংস্থা ১.৬৭ শতাংশ দায়ের জন্য দায়ী। এই সংস্থাগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো অডিট না হওয়া এবং পেশাদার হিসাবরক্ষকের অভাব দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আর্থিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
SPFMS-এর অতিরিক্ত সেক্রেটারি ও জাতীয় প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জিয়াউল আবেদিনের মতে, বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবে টেকসই SOE-গুলোই টিকে থাকা উচিত। তিনি জোর দেন, এই সংস্থাগুলোর রূপান্তরের জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ব্যবসা মডেল গড়ে তোলাই একমাত্র সমাধান। তার মতে, অপ্রয়োজনীয় সংস্থাগুলোকে পুনর্গঠন বা বন্ধ করা ফিসকাল রিস্ক কমাতে সহায়ক হবে।
মনিটরিং সেল-এর পরিচালক জেনারেল রাহিমা বেগম উল্লেখ করেন, নতুন PPE ম্যানুয়াল সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও লিজ চুক্তির স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক দায় কমাতে সহায়তা করবে। ম্যানুয়ালটি সম্পদের তালিকা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং লিজ চুক্তির রেকর্ডিং প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে। এভাবে বাজেটের বাইরে থাকা লিজের পরিমাণ সনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো আর্থিক শাসনের মান উন্নত করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, নতুন ম্যানুয়ালের কার্যকর বাস্তবায়ন যদি সময়মতো হয়, তবে দেশের সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনবে। তবে, পেশাদার হিসাবরক্ষকের ঘাটতি এবং সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের কারণে বাস্তবায়ন ধীর হতে পারে। তাই সরকারকে প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, PPE ও লিজ ম্যানুয়াল দেশের ফিসকাল ঝুঁকি হ্রাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি সংস্থাগুলো ম্যানুয়ালের নির্দেশনা মেনে চলতে পারে এবং শাসন কাঠামো শক্তিশালী হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজেটের স্বচ্ছতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা উন্নত হবে। অন্যদিকে, বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতা বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি নীতির কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করবে।



