ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় ধরমন্ডল ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জিতু মিয়ার গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং তার পরবর্তী হিংসা-সংঘর্ষের ফলে পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশ অশান্তিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ১২ জানুয়ারি পূর্ব বিরোধের পর ঘটিত ছয় ঘণ্টার সংঘাতে অন্তত ২৫ জন, নারী‑শিশুসহ, আহত হয় এবং চারজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। একই দিনে জিতু মিয়া মাথায় গুলি পেয়ে প্রাণ হারান।
এই ঘটনার পর গ্রামজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে পুরুষদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে বেশ কয়েকটি পাড়া‑মহল্লা কার্যত শূন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীরা ও শিশুরা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন, ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ধরমন্ডল নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই দিনের মধ্যে উপস্থিতি প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে পূর্বে ৯০ শতাংশের উপরে ছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিমল চন্দ্র রায় জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা সন্তানকে পাঠাতে অনিচ্ছুক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রামে ফিরে আসতে চান না। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আকলিমা বেগমের মা উল্লেখ করেন, “গাঁয়ে হিংসা ঘটেছে, তাই আমরা অন্য এলাকায় শরণ নিয়েছি; যদি আমাদের সন্তান একা থাকে তবে মারধর হতে পারে।”
পূর্বে ১২ জানুয়ারি জিতু মিয়া ও কুতুব মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গৃহ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। ওই রাতে কয়েকটি ঘর ও দোকান পুড়ে গিয়েছিল, এবং বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, রমজানের বিদেশি ছাগল খামার থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মূল্যমানের ২০টি দুগ্ধ গাভী চুরি হয়েছে, এবং তার দুটো পাকা ভবন ধ্বংস হয়েছে। একইভাবে কুতুব মিয়ার দুটো পাকা ভবন ও দশটি টিনের ঘরে আগুন লাগায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো গবাদি পশু ও সম্পত্তি মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।
ধরমন্ডল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শফিক মিয়া উল্লেখ করেন, “সংঘর্ষের পর কোনো প্রাণহানি হলে প্রতিপক্ষের বাড়ি-ঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ড স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।” তিনি এও জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে চারজনকে গ্রেফতার করেছে এবং তদন্ত চালু রয়েছে।
পুলিশের মতে, জিতু মিয়ার হত্যার সঙ্গে যুক্ত রমজান ও কুতুব মিয়ার বাড়িতে পৌঁছে ধ্বংসাবশেষ, জ্বলে যাওয়া দেয়াল ও ভাঙা জানালা-দরজা দেখা গিয়েছে। তদন্তকর্তারা এখনো হত্যার সুনির্দিষ্ট প্রেরণা ও সংশ্লিষ্ট সকলের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য তথ্য সংগ্রহ করছেন। বর্তমানে অপরাধমূলক মামলায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে; গ্রেফতারকৃত চারজনকে আদালতে হাজির করা হবে এবং পরবর্তী শুনানির তারিখ শীঘ্রই নির্ধারিত হবে।
স্থানীয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশি তদারকি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে এবং অস্থায়ী শেল্টার গঠন করে শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করা হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না পেয়ে উদ্বিগ্ন, ফলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসতে সময় লাগবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর গ্রামবাসীর জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে; পুরুষ শ্রমিকদের অনুপস্থিতি স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে এবং নারীদের উপর বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। সামাজিক সংহতি পুনর্গঠনের জন্য স্থানীয় স্বশাসন ও আইনশাসন সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে পুনরায় এমন হিংসাত্মক ঘটনা না ঘটে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।



