বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গত সপ্তাহে বিনিয়োগের ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি, রপ্তানি পারফরম্যান্স, সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস, শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, জিডিপি বৃদ্ধির গতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসে পরিবর্তনসহ বহু দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) জানিয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগের হ্রাস এবং মুদ্রাস্ফীতির উচ্চ স্তর আগামী সরকারের জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নীতি অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং ঋণ খরচের বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকরণ এবং আয়ের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গার্মেন্টস সেক্টরে রপ্তানি দৃশ্যপট ইতিবাচক রয়ে গেছে; জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭.০৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই বৃদ্ধি মূলত শিপমেন্টের সময়সূচি পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির প্রভাবের ফলে ঘটেছে। রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমে এবং গার্মেন্টস শিল্পের আয় বৃদ্ধি পায়।
সরকারি বাজেটের দিক থেকে, এই আর্থিক বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ প্রায় ১২.৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। প্রথম পাঁচ মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং ব্যয় অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে। ফলে অবকাঠামো ও সামাজিক সেবার কিছু প্রকল্পে বিলম্বের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ডিএসইএক্স সূচকের সাম্প্রতিক পুনর্গঠন বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বহুজাতিক সংস্থা ইউনিলিভার সূচি থেকে বাদ পড়ে এবং কিছু দুর্বল মৌলিক সূচকযুক্ত শেয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই পরিবর্তন সূচকের গঠন পদ্ধতি এবং বাজারের যুক্তিসঙ্গততা সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
শেয়ারবাজারে এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। সূচকের অস্থিরতা এবং দুর্বল শেয়ারের অন্তর্ভুক্তি বাজারের স্বাভাবিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, যা স্বল্পমেয়াদে লিকুইডিটি এবং মূলধন প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে, বর্তমান আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি ৪.৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি শিল্প উৎপাদনের শক্তিশালী পারফরম্যান্স এবং কৃষি খাতে সীমিত উন্নতি। যদিও মোট বৃদ্ধি ইতিবাচক, তবে মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিয়োগের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাধা হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ২০২৬ আর্থিক বছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস হ্রাস করেছে। পূর্বাভাসের হ্রাস দেশের অর্থনৈতিক নীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই পূর্বাভাসের পরিবর্তন নীতি নির্ধারকদের জন্য সতর্কতা সংকেত হিসেবে কাজ করবে।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পাবলিক ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্পের সময়মত বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের জন্য আর্থিক শর্ত সহজ করা দরকার।
শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা বাড়াতে সূচকের গঠন পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা এবং দুর্বল শেয়ারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। এটি বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার এবং মূলধন বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
গার্মেন্টস রপ্তানির ধারাবাহিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়লেও, মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিয়োগের ঘাটতি সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ অর্থনীতি বিনিয়োগের ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি, বাজেটের সংকোচন এবং শেয়ারবাজারের অস্বচ্ছতা সহ বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তবে গার্মেন্টস রপ্তানির উত্থান এবং শিল্প ভিত্তিক জিডিপি বৃদ্ধি কিছু ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। নীতি নির্ধারকদের জন্য মূল কাজ হবে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়।



