বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল বিএনপি নেতৃত্বাধীন মতবিনিময় সভায় গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। উপস্থিতদের মধ্যে এক কিশোরী, যার বাবা গত কয়েক বছর আগে গুমের শিকার, তার মুখে অশ্রু ভাসিয়ে ‘এটা তো অঙ্ক না যে, আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা মৃত!’ বলে কাঁদতে কাঁদতে তার কষ্ট প্রকাশ করেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন তরেক রহমান সভার মঞ্চে বসে উপস্থিত ছিলেন এবং কিশোরীর বেদনাদায়ক কথায় স্পর্শিত হয়ে চোখে জল দেখা যায়। তিনি মঞ্চে বসে গম্ভীর স্বরে পরিবারের কষ্টের কথা শোনার পর কয়েকবার মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করেন।
এই সভা মূলত গুম, নিঃশব্দ হত্যা এবং নির্যাতনের শিকারদের পরিবারকে একত্রিত করে তাদের কণ্ঠস্বর শোনানোর উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়। পরিবারগুলোর সদস্যরা তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা ও সরকারকে জবাবদিহি করার দাবি জানিয়ে একত্রে দাঁড়িয়েছেন।
বিএনপি নেতৃত্বের মতে, গুমের ঘটনা পূর্ববর্তী সরকারের অধীনে ব্যাপকভাবে ঘটেছে এবং এখনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি দায়িত্ব থেকে মুক্তি পায়নি। তরেক রহমান উল্লেখ করেন, গুমের শিকারদের পরিবারকে সমর্থন করা এবং তাদের কণ্ঠস্বরকে শাসনকালের নীতি-নিয়মে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
অধিকাংশ উপস্থিত পরিবারই দীর্ঘদিনের কষ্টের পরেও আশা না হারিয়ে, সরকারের কাছ থেকে স্বচ্ছ তদন্ত ও গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার দাবি করে। তারা জানিয়েছেন, গুমের শিকারদের পরিবারকে সামাজিক ও আর্থিকভাবে সমর্থন না করলে সমাজের ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিএনপি কর্মকর্তারা এই ধরনের সভা চালিয়ে গুমের শিকারদের প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধ জোরদার করতে চান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লক্ষ্য রাখছেন। তরেক রহমানের মতে, গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা কঠিন।
অবশ্যই সরকারী পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে সরকারী সূত্রে গুমের শিকারদের পরিবারকে সহায়তা ও তদন্তের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানানো হয়। এই কমিটি এখনও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ বলে পরিবারগুলো অভিযোগ জানায়।
বিএনপি এই সভা মাধ্যমে গুমের শিকারদের সমস্যাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয়। তরেক রহমানের উপস্থিতি এবং তার আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া এই বিষয়ের প্রতি জনমতকে তীব্র করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, গুমের শিকারদের পরিবারকে রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে ধরা বিএনপির জন্য ভোটার ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি কৌশল হতে পারে, বিশেষ করে যারা গুমের শিকার পরিবার থেকে গৃহীত সমর্থন পেতে চায়। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার মানবিক কষ্টকে কাজে লাগানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সামাজিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই সভার পর গুমের শিকারদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, গুমের শিকারদের পরিবারকে যথাযথ আইনি সহায়তা ও মানসিক সমর্থন প্রদান করা জরুরি।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি গুমের শিকারদের জন্য আরও সমাবেশের পরিকল্পনা করছে এবং সরকারকে গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার ও দায়িত্বশীলদের বিচারের জন্য ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাবে। তরেক রহমানের মন্তব্য অনুযায়ী, গুমের শিকারদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় এবং তা রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ।
এই সভা গুমের শিকার পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তারা তাদের কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষা সরাসরি শাসক ও বিরোধী দলের নেতাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। ভবিষ্যতে গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



