মহিলা নূরেন ফাইজা ইকরাম, মাত্র সাত বছর তিন মাস বয়সে ক্যান্সার রোগে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু ২০২১ সালের ২৯ মে ঘটেছে, যখন তিনি ২০১৯ সালের মার্চে রক্তের ক্যান্সার (ব্লাড ক্যান্সার) নির্ণয় করিয়েছিলেন। নূরেনের পরিবারে মা নাজনীন সুলতানা, যিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক, এবং বাবা মো. তুহিন ইকরাম, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ডিজিএম, পাশাপাশি দুই সন্তান—আট বছর বয়সের ছেলে মাধুর্য এবং দুই বছর বয়সের মেয়ে মেহরিশ—রয়েছেন।
নূরেনের শৈশব স্বাভাবিক ছিল; পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কোনো বড় অসুস্থতা থেকে মুক্ত ছিলেন। তবে ঘুমের সময় ক্লান্তি এবং হালকা কাশির লক্ষণগুলো তার মা-কে উদ্বিগ্ন করে, ফলে শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্পূর্ণ রক্তপরীক্ষা (CBC) এবং রক্তের ছবি (ব্লাড পিকচার) পর্যালোচনা করে দ্রুতই রক্তের ক্যান্সার নির্ণয় করা যায়।
নূরেনের চিকিৎসা শুরু হয় বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে। প্রথম পর্যায়ে তিনি ভারতের মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালসহ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, যেখানে ছয় মাসের বেশি সময় কাটাতে হয়। এই সময়ে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে শিক্ষা ক্যাডার সমিতি, যারা প্রায় বিশ হাজার টাকা দান করে। যদিও এই পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় সামান্য, তবু তা পরিবারকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দেয় এবং আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়।
চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নূরেনকে ভারত ও বাংলাদেশে বারবার ভ্রমণ করতে হয়। তার মা উল্লেখ করেন, রোগের অগ্রগতি ও চিকিৎসার জটিলতা তাদের জন্য শারীরিক ও মানসিক দু’ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। তবু পরিবার তার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, যদিও শেষ পর্যন্ত নূরেনের শারীরিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।
নূরেনের মৃত্যু তার পরিবার ও আশেপাশের মানুষের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে তার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতে একটি বৃত্তি পরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়, যা ‘মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি’ নামে পরিচিত। এই বৃত্তি ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা খরচ, শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা প্রদান করতে লক্ষ্য রাখে। বৃত্তির মাধ্যমে নূরেনের নাম ও তার লড়াইয়ের সাহস অন্য রোগীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
বৃত্তি প্রতিষ্ঠার পেছনে নূরেনের মা নাজনীন সুলতানা জানান, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সমর্থনই তাদের জন্য শক্তির উৎস ছিল। তিনি বলেন, এই বৃত্তি ভবিষ্যতে একই ধরনের রোগে ভোগা শিশুদের জন্য একটি সুরক্ষামূলক জাল তৈরি করবে, যাতে তারা চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়।
মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি এখন পর্যন্ত কয়েকজন শিশুর চিকিৎসা খরচে অবদান রেখেছে এবং আরও অনেকের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া চলছে। বৃত্তি গ্রহণকারী শিশুরা পরিবারে আশা ও আত্মবিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ ঘটাতে পারছে, যা নূরেনের স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে।
ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারকে সহায়তা করার জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নূরেনের কেসে দেখা যায়, দ্রুত নির্ণয়, সময়মতো চিকিৎসা এবং আর্থিক সহায়তা রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, রক্তের ক্যান্সার (লিউকেমিয়া) এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো—যেমন ক্লান্তি, অনিয়মিত কাশি, রক্তের রঙ পরিবর্তন—দ্রুত সনাক্ত করা এবং উপযুক্ত রক্তপরীক্ষা করা রোগের অগ্রগতি রোধে সহায়ক।
নূরেনের পরিবার এখনো তার স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি পরিবার এই ধরনের সহায়তা পেতে পারে, এটাই তাদের লক্ষ্য।
ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত শিশুরা ও তাদের পরিবারকে সমর্থন করার জন্য সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক সমর্থন প্রদান করা জরুরি। নূরেনের গল্প এই প্রয়োজনীয়তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা আমাদেরকে রোগীর পাশে দাঁড়াতে এবং সহায়তার হাত বাড়াতে অনুপ্রাণিত করে।



