প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান শনিবার সকাল ঢাকা‑এর খামারবাড়ি এলাকায় অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে সাংবাদিক ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (নেওয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ছাপা, অনলাইন, টেলিভিশন ও সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়।
মতিউর রহমানের মতে, সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ বা সময়ের পার্থক্য যাই হোক না কেন, তা সমগ্র মিডিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ঐক্য বজায় রাখা সংবাদ গুণমান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সমগ্র গণমাধ্যমের স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
এই সমাবেশকে তিনি মিডিয়ার ইতিহাসে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত ৫৫ বছর এবং বিশেষ করে শেষ ১৫ বছরে সাংবাদিকদের একত্রিত হওয়া আগে কখনো এতটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ইতিবাচক সূচক।
মতিউর রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, মত, চিন্তা বা আদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সহ সব ক্ষেত্রেই সমঝোতা ও সংহতি বজায় রাখতে হবে। তিনি একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এবং সহানুভূতি প্রদর্শনের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেন।
তিনি অতীতের মিডিয়া দমন নীতি নিয়ে সতর্ক করেন। ১৯৭৫ সালে সরকারী আদেশে সব পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছিল, যা তিনি দেশের স্বাধীনতার পরের প্রথম স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই ধরনের পদক্ষেপের কোনো বৈধতা নেই, তিনি বলেন।
এরপরের সামরিক শাসন এবং গণতান্ত্রিক শাসনকালে মিডিয়ার ওপর চাপের মাত্রা পরিবর্তিত হলেও, মূলত একই রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা ছোট, মাঝারি ও বড় সব ধরণের প্রকাশনায় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শফিক রেহমানের ওপর সাম্প্রতিক নির্যাতনের প্রসঙ্গেও মতিউর রহমানের মন্তব্য শোনা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, শফিক রেহমানের মতো সাংবাদিকের জীবনে সরকারী হস্তক্ষেপের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। নিজের ৫৫ বছরের পেশাগত জীবনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, এমন হস্তক্ষেপ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
মতিউর রহমানের মতে, স্বাধীন সাংবাদিকতা না থাকলে সরকার সত্যিকারের দায়িত্বশীল হতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারই যদি আমাদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তা অতীতের মতোই পুনরাবৃত্তি হবে না, বরং আরও কঠোর দমন নীতি গ্রহণ করতে পারে।
এখনকার সময়ে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিসরে পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত, তখন মিডিয়ার ঐক্য ও স্বাধীনতা দেশের গণতন্ত্রের সুরক্ষায় অপরিহার্য। তিনি ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানান, যাতে ভোটারদের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া যায়।
মতিউর রহমানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত সাংবাদিকরা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। তারা একমত যে, সমবেত হয়ে কাজ করলে মিডিয়া সংস্থাগুলো সরকারী নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ত্বরিত ও সঠিক প্রতিবেদন দিতে পারবে।
সংগঠনের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের সম্মেলন ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে, যাতে সাংবাদিকদের মধ্যে সংলাপ ও সমন্বয় বাড়ে। তারা আশা প্রকাশ করেন, একসঙ্গে কাজ করলে মিডিয়া স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারবে।
সর্বশেষে, মতিউর রহমানের বার্তা স্পষ্ট: সাংবাদিকদের ঐক্য, সংহতি এবং স্বাধীনতা দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ভিত্তি, এবং তা বজায় রাখতে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



