সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলার ছয় নম্বর ওয়ার্ডে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাত ১২টার দিকে এক নার্সের সঙ্গে রোগীর আত্মীয়দের তর্কের পর একটি দল রোগীর পরিবার ও অন্যান্য কর্মীকে একত্রিত করে হিংসাত্মক কাজ করে। প্রথমে নার্সদের সঙ্গে তর্কবিতর্কের পর তারা ওয়ার্ডের দরজা ভেঙে, ফার্নিচার নষ্ট করে এবং ওয়ার্ডে উপস্থিত নারীর শিক্ষানবিশ ডাক্তারকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে। একই সময়ে চিকিৎসা সহায়তাকারী কর্মীদের ওপরও মারধর করা হয়, ফলে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতালের সূত্রে জানা যায়, আক্রমণের সময় এক নারী শিক্ষানবিশ ডাক্তারকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় এবং অন্য কয়েকজন কর্মীকে মারধর করা হয়। আক্রমণের ফলে ওয়ার্ডে কাজ করা তিনজন ওয়ার্ডবয়ও আঘাত পায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষানবিশ ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরা তৎক্ষণাৎ তিনজন সন্দেহভাজনকে আটক করে, পরে পুলিশকে জানিয়ে দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনকে গ্রেফতার করে স্থানীয় থানায় হেফাজতে নেয়।
হাসপাতালের উপপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান জানান, আক্রমণের পর থেকে শিক্ষানবিশ ডাক্তার ও অন্যান্য চিকিৎসা কর্মীরা নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি বজায় রাখবে। তারা রাতেই কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়ে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলদের শাস্তি দাবি করেছে। উপপরিচালক রাহমান আরও উল্লেখ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।
হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি, রোগীর আত্মীয়দের চিকিৎসা সেবা নিয়ে অসন্তোষের কারণেও এই হিংসা ঘটেছে বলে সূত্রগুলো জানায়। রোগীর পরিবার ও নার্সদের মধ্যে তর্কের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত হিংসাত্মক কাজের রূপ নেয়।
পুলিশের মতে, আক্রমণের সঙ্গে জড়িত তিনজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করার পর তদন্ত চালু হয়েছে। তদন্তকর্তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও রেকর্ড, সাক্ষী বিবৃতি এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা ক্যামেরার রেকর্ড সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছেন। বর্তমানে অপরাধের প্রকৃতি, আক্রমণের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য ফৌজদারি তদন্ত চলছে।
হাসপাতালের প্রশাসন জানিয়েছে, আক্রমণের পর থেকে নিরাপত্তা কর্মী বাড়ানো হয়েছে এবং রোগী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শিক্ষানবিশ ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরা এখনও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং কর্মবিরতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন না।
আইনি দিক থেকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে আক্রমণকারী ও সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় আদালতে মামলার শোনানির তারিখ নির্ধারিত হবে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে অপরাধীর শাস্তি নির্ধারিত হবে।
এই ঘটনার পর, সিলেটের স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন উভয়ই হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি, অভিযোগের সমাধান প্রক্রিয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
সিলেটের বাসিন্দা ও চিকিৎসা কর্মীরা এই ঘটনার ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দাবি করছেন যে হাসপাতালের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোগী ও কর্মীদের সেবা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে, রোগীর আত্মীয়দেরও চিকিৎসা সেবা নিয়ে সন্তোষজনক সমাধান না পেলে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
হাসপাতালের কর্মবিরতি ও আইনি পদক্ষেপের ফলে রোগী সেবা কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে, তবে প্রশাসন জানিয়েছে যে জরুরি রোগী ও গুরুতর অবস্থা থাকা রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে হাসপাতালের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা এবং রোগীর অধিকার রক্ষার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
সামগ্রিকভাবে, সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই হিংসাত্মক ঘটনা রোগী, পরিবার এবং চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।



