বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) প্রতি বছর ১০ শতাংশের বেশি হারে চাহিদা বাড়ছে। এই প্রবণতা মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি সংস্থাকে সরবরাহ বাড়াতে হয়। তবে ২০২৪ সালে মোট আমদানি বাড়লেও, শেষের দিকে গ্যাসের ঘাটতি তীব্রতর হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এলপিজি আমদানি ছিল ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। পরের বছর, ২০২৩-এ, এই পরিমাণ কমে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টনে নেমে আসে, যা প্রায় দেড় লাখ টনের হ্রাস। ২০২৪ সালে আবার ১৬ লাখ ১০ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন বৃদ্ধি।
আমদানি বাড়লেও, মোট গ্যাসের প্রাপ্যতা প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। বছরের শেষের দিকে মজুদের পরিমাণ দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়, ফলে বাজারে ঘন ঘন শূন্যতা দেখা দেয়। ভোক্তারা দ্বিগুণ দামের পরেও সিলিন্ডার পেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্সধারী মোট ৫২টি কোম্পানি রয়েছে। এদের মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব গ্যাস ভরাট প্ল্যান্ট রয়েছে, আর ২৩টি কোম্পানির আমদানি করার সক্ষমতা রয়েছে। গত বছর, ১৭টি কোম্পানি কোনো না কোনো মাসে গ্যাস আমদানি করেছে, তবে শুধুমাত্র ৮টি কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে মাসিক আমদানি চালিয়ে গেছে।
অনেক কোম্পানি বছরের শুরুতে আমদানি শুরু করলেও, বছরের শেষের দিকে তাদের আমদানি বন্ধ করে দেয়। এই অনিয়মিত প্রবাহ সরবরাহের অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলেছে। বিইআরসির একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, মাসিক আমদানি হ্রাসের তথ্য সরকারী দপ্তরে রয়েছে, এবং নিয়মিত আমদানি করা সংস্থাগুলোর জন্য অতিরিক্ত অনুমতি প্রদান করা উচিত ছিল।
অনুমতি প্রক্রিয়ায় দেরি হলে বর্তমান সংকট এড়ানো সম্ভব হতো, এ কথায় তিনি জোর দেন। সরকারকে সময়মতো আমদানি কোটা বাড়িয়ে দিলে বাজারে গ্যাসের ঘাটতি কমে যেত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বিইআরসি ইতিমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আমদানি অনুমতি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
বিশেষত, আমদানি প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। বিইআরসি অনুমোদিত আমদানি কোটা বৃদ্ধি করে ব্যবসায়ীদের দ্রুত কাজ শুরু করতে সহায়তা করেছে। এই উদ্যোগের ফলে শীঘ্রই গ্যাসের প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমান সংকট মূলত সরবরাহজনিত, চাহিদা নয়। গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও, আমদানি ও বিতরণে সৃষ্ট বাধা বাজারে ঘাটতি সৃষ্টি করেছে।
এলপিজি বাজারের এই পরিস্থিতি ব্যবসায়িক চক্রে প্রভাব ফেলবে। গ্যাসের ঘাটতি রেস্তোরাঁ, গৃহস্থালী এবং শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে, গ্যাসের দামের উত্থান ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তবে দাম স্থিতিশীল হতে পারে এবং ঘাটতি কমে যাবে। তবে, আমদানি অনুমতি ও আর্থিক সহায়তার দিক থেকে ধারাবাহিক নীতি না থাকলে, বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকতে পারে।
বিইআরসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে এখনো গ্যাসের সঞ্চয় বাড়ানো, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর কার্যকরী সমন্বয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো না নিলে, ভোক্তারা উচ্চ দামে গ্যাস কেনার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে না।
সংক্ষেপে, ২০২৪ সালে এলপিজি আমদানি বৃদ্ধি সত্ত্বেও, সরবরাহের অস্থিরতা ও বাজারের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থতা গ্যাসের দামের উত্থান এবং সিলিন্ডার ঘাটতির দিকে নিয়ে গেছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপই এই সংকটের সমাধানের মূল চাবিকাঠি হবে।



