ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) ১১টি ইসলামিক পার্টি নিয়ে গঠিত জোট থেকে বেরিয়ে নিজস্বভাবে পার্লামেন্টের ১৩তম নির্বাচন লড়াই করবে, এ ঘোষণার ফলে নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। জোটটি মূলত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন ব্লকের মোকাবিলার জন্য গঠিত হয়েছিল; জামাত‑ই‑ইসলাম এই গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল এবং ইসলামিক আদর্শের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্প উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।
এই জোটের সূচনা হয়েছিল ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে, যেখানে প্রথমে পাঁচটি ইসলামিক দল একত্রিত হয়। পরে জোমিয়াত‑এ‑উলমা‑ই‑ইসলাম দলটি বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়, আর জামাত ও আর ছয়টি দল যোগ দিয়ে জোটের সংখ্যা বাড়িয়ে একাদশ পার্টি পর্যন্ত পৌঁছায়। জোটের মূল লক্ষ্য ছিল “একই ভোটের বাক্স” নীতি অনুসরণ করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একক প্রার্থী দায়ের করা, যাতে ইসলামিক শক্তি একত্রে ভোট সংগ্রহ করতে পারে।
আইএবির সেক্রেটারি জেনারেল ইউনুস আহমেদ জানান, তাদের দলই এই “একই ভোটের বাক্স” কৌশলের প্রধান সমর্থক ছিল এবং জোটের মধ্যে এই নীতি বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। তবে জোটের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ বাড়ার ফলে আইএবি জোট ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহিউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, আইএবির প্রস্থান জোটের জন্য বড় ধাক্কা এবং ভোটের বিভাজন শেষ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে কাজ করবে। তিনি বলেন, জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির শক্তি কমানো, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জামাত‑ই‑ইসলাম নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর পারফরম্যান্স দুর্বল হতে পারে।
আইএবির সেক্রেটারি জেনারেল ইউনুস আহমেদ জোটের অভ্যন্তরীণ পরিচালনায় জামাতের আচরণকে বড় ভাইয়ের মতো বর্ণনা করেন, যেখানে জামাত কোনো পরামর্শ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, জোটের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ না করে একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।
আইএবের একজন উপদেষ্টা, যিনি নাম প্রকাশ না করে কথা বলেছেন, জানান, বিএনপি আইএবিকে তাদের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে আইএবি নিজের জোটের স্বার্থ রক্ষার জন্য তা প্রত্যাখ্যান করে। তিনি বিশ্বাস করেন, জোটের বিচ্ছেদ মূলত অবিশ্বাস এবং মতবিরোধের ফল, যার দায়িত্ব জামাতের ওপর আরোপিত।
আইএবের যৌথ সেক্রেটারি জেনারেল ও মুখপাত্র গাজি আতাউর রহমানের মতে, জামাত একতরফা তিনটি নতুন দলকে জোটে যুক্ত করে এবং সিট বণ্টন শুরু করে, যা তিনি অপমানজনক ও স্বৈরাচারী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জোটের মধ্যে আলোচনার সুযোগ না দিয়ে সিট বরাদ্দ করা তাদের অধিকার লঙ্ঘন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই বিচ্ছেদ ইসলামিক ভোটারদের মধ্যে বিভাজন ঘটাবে এবং জোটের সমগ্র পারফরম্যান্সকে দুর্বল করবে। ফলে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ভোটের মার্জিন বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে ইসলামিক পার্টিগুলোর ঐতিহাসিক শক্তি বেশি।
পরবর্তী সময়ে আইএবি স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করবে এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালাবে। জামাতের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ প্রকাশিত হয়নি, তবে তারা সম্ভবত নতুন সিট বণ্টন নিয়ে পুনরায় আলোচনা করতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে পুনর্মিলন বা নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, জোটের এই ভাঙ্গন বাংলাদেশীয় রাজনীতিতে নতুন গতিপথ তৈরি করবে, যেখানে ইসলামিক পার্টিগুলোর সমন্বিত শক্তি হ্রাস পাবে এবং প্রধান বিরোধী গোষ্ঠীর জন্য ভোটের সুযোগ বাড়বে। নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে গড়ে উঠবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলকে প্রভাবিত করবে।



