শুক্রবার ভোরে হাভানার মার্কিন দূতাবাসের সামনে প্রায় এক দশ হাজার কিউবান সমাবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। অংশগ্রহণকারীরা কিউবা ও ভেনেজুয়েলার পতাকা হাতে তুলে, শীতল বাতাসে টুপি ও জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় রাস্তায় জমায়েত হয়। এই প্রতিবাদের মূল দাবি হল যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর আরোপিত আরোপের প্রতিক্রিয়া, যাকে কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রতিবাদকারীরা ম্যালেকন উপকূলীয় সড়কের বরাবর সমাবেশ করে, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ তীব্র হলেও জনতার উচ্ছ্বাস কমে না। কিউবান নাগরিকরা কিউবা ও ভেনেজুয়েলার পতাকা উঁচু করে, শীতল আকাশের নিচে একত্রে চিৎকার করে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও পদক্ষেপের বিরোধিতা প্রকাশ করে। সমাবেশে উপস্থিতদের সংখ্যা এবং দৃশ্যপট স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে বিশাল ছিল, যা কিউবায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রতিফলন।
পটভূমিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা অভিযান, যেখানে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর কিউবীয় সেনা ও গোয়েন্দা কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের খবর আসে। সূত্র অনুযায়ী, মাদুরোকে রক্ষা করার সময় ৩২ কিউবান সৈন্য ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনা কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি মুখোমুখি হওয়া হিসেবে বিবেচিত, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল সামরিক পোশাক পরিধান করে দূতাবাসের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে, জনগণের উদ্দেশ্যে ঐক্যের আহ্বান জানান। তিনি দূতাবাসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “না, সাম্রাজ্যবাদীরা, আমরা আপনাদের একটুও ভয় পাই না। আমরা হুমকি মেনে নিই না। আপনারা আমাদের ভীত করতে পারবেন না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও হুমকির প্রতি কিউবার দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল ও আর্থিক সম্পদ কিউবায় প্রবাহিত না হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি হাভানার সরকারকে সতর্ক করে বলেন, “এখনই সমঝোতা না করলে পরে অনেক দেরি হয়ে যাবে।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান অবনতির সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দু’দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত তীব্রতর হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতি প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কিউবা “শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত” লড়াই করতে প্রস্তুত, যা দেশের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি নির্দেশ করে। এই দৃঢ় অবস্থান কিউবাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য আরও দৃঢ় করে তুলতে পারে।
প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক কথোপকথন তীব্রতর হয়েছে। কিউবা-যুক্তরাষ্ট্রের শীতল সম্পর্ক এখন নতুন স্তরে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরের প্রতি কঠোর রেটরিক ব্যবহার করছে। হাভানার দূতাবাসের সামনে এই বৃহৎ সমাবেশ কিউবীয় সরকারের আন্তর্জাতিক নীতি ও অভ্যন্তরীণ সমর্থন উভয়ই পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বর্তমান উত্তেজনা কিউবার অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষত যখন যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। একই সঙ্গে, কিউবার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় রেটরিক আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত ভেনেজুয়েলা ও অন্যান্য বামপন্থী সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে।
পরবর্তী সময়ে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা সম্ভব হবে কিনা, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে। হাভানায় অনুষ্ঠিত এই বৃহৎ বিক্ষোভ কিউবীয় জনগণের সরকারের নীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি অসন্তোষের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



