দক্ষতা‑হীন রাষ্ট্রযন্ত্রের ফলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে এবং নাগরিকদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে; এই অবস্থা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে যখন সরকারী সেবা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা বাড়ছে।
যেকোনো পেশায় দক্ষতা মৌলিক; মোমবাতি তৈরিকারী হোক বা সার্জন, কাজের গুণগত মান সরাসরি জীবন‑মৃত্যুর সীমা নির্ধারণ করে। একই নীতি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রযোজ্য, কারণ সরকার একাধিক মানুষের জীবনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে এবং তাই তাকে ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ বলা হয়।
যন্ত্রের কাজ নিয়মের ওপর নির্ভরশীল; নিয়ম ভঙ্গ হলে যন্ত্র নষ্ট হয়। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যদি নীতি, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ঘাটতিতে থাকে, তবে শৃঙ্খলা দুর্বল হয়, অর্থনীতি দিশা হারায় এবং জনগণের বিশ্বাস ধীরে ধীরে বিলীন হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি দেশের নৈতিক কাঠামোকে আঘাত করে। নাগরিকরা কেবল পাসপোর্ট বা চাকরি নয়, ন্যায়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগও চান; এই চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হ্রাস পেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের মতে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে এবং চাহিদা বাড়তে থাকে, তখন রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই তত্ত্বটি বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে অদক্ষ শাসনব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
দক্ষিণ আমেরিকায় একটি দেশ, যা একসময় সমৃদ্ধি ও উচ্চমানের জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত ছিল, আজ দুর্বল নীতি, অপ্রতুল পরিকল্পনা এবং অবিকশিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র আর কার্যকরী যন্ত্র নয়, বরং জংধরা লোহার স্তূপে পরিণত হয়েছে।
এর বিপরীতে পূর্ব এশিয়ার দুটি দেশ—দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর—দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লি কুয়ান ইউ একবার উল্লেখ করেন, তিনি সৎ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং এখন তা নিজে থেকেই কাজ করবে; নেতৃত্বের কাজ কেবল দিকনির্দেশনা নয়, বরং সঠিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
এই বৈপরীত্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে। যেখানে অদক্ষতা অব্যাহত থাকে, সেখানে জনমত পরিবর্তনের চাহিদা বাড়বে এবং নির্বাচনী পরিসরে নতুন সংস্কারমূলক শক্তির উত্থান সম্ভব। অন্যদিকে, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা সরকারগুলোকে নাগরিকদের আস্থা অর্জনে সুবিধা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তাই বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্তিশালী করা, নীতি প্রয়োগে দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখা জরুরি, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার হয় এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।



