একটি সাম্প্রতিক ল্যানসেট জার্নালের পর্যালোচনা অনুযায়ী গর্ভবতী মহিলাদের জন্য প্যারাসিটামল গ্রহণ নিরাপদ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এতে অটিজম, ADHD বা অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দল পরিচালনা করেছে এবং গর্ভধারণের সময় এই ওষুধের ব্যবহার নিয়ে চলমান বিতর্ককে শেষ করার লক্ষ্য রাখে।
গবেষণার প্রধান ফলাফলগুলোতে দেখা যায়, প্যারাসিটামল গ্রহণের সঙ্গে শিশুর অটিজম বা মনোযোগ ঘাটতির কোনো সংযোগ সনাক্ত করা যায়নি। গবেষকরা উচ্চমানের সিবলিং স্টাডি ব্যবহার করে জেনেটিক পার্থক্য ও পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব বাদ দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, ফলে ফলাফলকে “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, গবেষণায় কম পক্ষপাতের ঝুঁকি থাকা এবং পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা গবেষণাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই ফলাফলগুলোকে সমর্থনকারী প্রধান গবেষক, গর্ভবতী রোগে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আসমা খালিলের মতে, “এই বিশ্লেষণে কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি, প্যারাসিটামল অটিজমের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কোনো প্রমাণ নেই”। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, গর্ভাবস্থায় নির্দেশিত মাত্রায় প্যারাসিটামল ব্যবহার করা নিরাপদ এবং চিকিৎসা নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গর্ভবতী নারীদের প্যারাসিটামল গ্রহণে সতর্কতা জানিয়ে, এটিকে “কোনো কাজে না আসা” ও “যথাসাধ্য এড়িয়ে চলা” দরকার বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের পর বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনা আসে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী প্যারাসিটামল ও তার ব্র্যান্ড টাইলেনল গর্ভধারণের সময় অটিজমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এমন ধারণা তখনই ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
তবে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখনও কিছু বিশেষজ্ঞের উদ্বেগকে স্বীকার করে, যদিও নতুন গবেষণার ফলাফল এই উদ্বেগকে কমিয়ে দেয়। পূর্বে প্রকাশিত কিছু গবেষণায় প্যারাসিটামল ও অটিজমের সম্ভাব্য সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, তবে সেসব গবেষণায় জেনেটিক পার্থক্য, পারিবারিক পরিবেশ এবং অন্যান্য সহগামী কারণগুলো যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। বর্তমান পর্যালোচনায় এই ধরনের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে, ফলাফলকে আরও নির্ভরযোগ্য করা হয়েছে।
ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রধান চিকিৎসা সংস্থাগুলোর পূর্বের নির্দেশনাও প্যারাসিটামলকে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ব্যথা উপশমকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নতুন গবেষণার ফলাফল এই নির্দেশনাকে পুনর্বলিত করে এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গর্ভাবস্থায় ব্যথা বা জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল প্রায়শই প্রথম পছন্দের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি অন্যান্য শক্তিশালী ব্যথানাশকের তুলনায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে, কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে ডোজ ও ব্যবহারের সময়সীমা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেনে চলা জরুরি।
এই গবেষণার প্রকাশের পর চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী নারীদের জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহারে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে বলছেন এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্যের কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করার আহ্বান জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে প্যারাসিটামল ও শিশুর বিকাশের সম্পর্ক নিয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ল্যানসেটের এই বিশাল পর্যালোচনা গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল নিরাপদ ব্যবহারকে নিশ্চিত করে এবং পূর্বে উত্থাপিত অটিজম সংক্রান্ত উদ্বেগকে বৈজ্ঞানিকভাবে খণ্ডন করে। গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা তাদের স্বাস্থ্যের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুর সুস্থ বিকাশে সহায়তা করবে।
আপনার গর্ভাবস্থার সময় কোনো ওষুধের ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ থাকলে, সর্বদা আপনার গাইনিকোলজিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং স্ব-নির্ণয় বা অনলাইন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।



