ওডেসা শহরের ১৬ তলা উচ্চতায় বসবাসরত মারিয়া, তার স্বামী সারগি এবং ৯ বছর বয়সী কন্যা ইভা রাশিয়ান ড্রোন ও বোমা হামলার ধারাবাহিকতা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুনরায় দেশ ত্যাগের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। রাশিয়া গত চার বছর ধরে ইউক্রেনের ওপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালিয়ে আসছে, এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওডেসা, দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর, বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছে।
মারিয়ার ১৬ তলা ফ্ল্যাটের বড় জানালার সামনে কালো সাগরের শান্ত পানির দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে সূর্যাস্তের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়। তিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ড্রোনের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে শহরের নিচের ভবনগুলোতে আগুন জ্বলে উঠলে তা স্পষ্ট দেখা যায়। এই দৃশ্য তাকে এবং তার পরিবারকে প্রতিদিনের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক রাখে।
ইভা, যিনি এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, ড্রোনের গতি ও আকৃতি চেনার দক্ষতা অর্জন করেছে। তিনি এয়ার রেইড সতর্কতা সক্রিয় হলে অনুসরণ করা সামাজিক মিডিয়া চ্যানেলের তালিকা গর্বের সঙ্গে দেখায়। তার বাবা সারগি জানান, ইভা জানে কোন সতর্কতা বাস্তবিক হুমকি নাকি কেবলমাত্র সতর্কতা, ফলে তার মানসিক চাপ কমে যায়।
সারগি উল্লেখ করেন, ড্রোনের গতি বাড়লে শব্দও তীব্র হয়, তাই তারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যায়। মারিয়া কয়েক মাস আগে ইভাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে ড্রোন যদি তাদের দিকে আসে তবে শোরগোল বাড়বে, আর তখনই লুকিয়ে থাকা প্রয়োজন। এই ধরনের সতর্কতা পরিবারকে রাশিয়ান আক্রমণের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে।
ওডেসা শহরটি রাশিয়ার সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে। বন্দর ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বোমা ও ড্রোন হামলা শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করার পাশাপাশি নাগরিকদের মনোবলকে ক্ষয় করার উদ্দেশ্য বহন করে। মস্কো এই আক্রমণকে কেবল অবকাঠামো নয়, জনগণের দৈনন্দিন জীবনের ওপরও চাপ সৃষ্টি করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
ড্রোনগুলো প্রায় মোটরসাইকেল আকারের, যা উচ্চ-উচ্চতার ভবনে আঘাত হানলে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং কাচ ও ধ্বংসাবশেষ ভিতরে ছিটকে পড়ে। এমন আঘাতের ফলে প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাতের সংখ্যা বাড়ছে, যা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলছে।
মারিয়া স্মরণ করেন, ইভা একবার ড্রোনের গতি খুব দ্রুত হওয়ায় লুকিয়ে থাকার সময় কমে যাবে বলে ভয় পেয়েছিল। সারগি তখন তাকে জানিয়েছিলেন যে ড্রোনের শব্দ বাড়লে তা কাছাকাছি আসার সংকেত, ফলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া যায়। এই অভিজ্ঞতা পরিবারকে প্রতিটি সতর্কতা সংকেতের সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শিখিয়েছে।
মারিয়া ও সারগি মূলত খেরসন অঞ্চল থেকে এসেছেন, যা ওডেসা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এবং বর্তমানে রাশিয়ার অধিকাংশ অংশ দখল করে আছে। ২০২২ সালে আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ইউক্রেন ত্যাগ করে জার্মানিতে শরণার্থী হিসেবে কয়েক মাস কাটিয়েছেন। তবে দূরত্বের কষ্ট সহ্য না করে পরিবারটি পুনরায় ইউক্রেনে ফিরে এসে ওডেসায় বসতি স্থাপন করেছে।
আক্রমণের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারগি আবারও দেশ ত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক চাপ আর ওডেসার জনগণের মনোবল হ্রাস করা, তাই পরিবারটি আবার নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার এই ধারাবাহিক আক্রমণকে কঠোর নিন্দা করেছে এবং ওডেসার বন্দরকে সুরক্ষিত রাখতে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা প্রদান করার কথা জানিয়েছে। গ্রেন করিডোরের মাধ্যমে গম ও শস্য রপ্তানি নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার নৌবাহিনীর কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপের পরিকল্পনা করছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, রাশিয়ার ড্রোন ব্যবহার কেবল সামরিক সুবিধা নয়, বরং নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির একটি কৌশল। তিনি বলেন, ওডেসার মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে রাশিয়া অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইউক্রেনের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
আসন্ন মাসগুলোতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার সময়সূচি, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা মিশন এবং ন্যাটোর অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো যদি সফল হয়, তবে ওডেসার নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে।
অবশেষে, মারিয়া, সারগি ও ইভার মতো পরিবারগুলো রাশিয়ার ধারাবাহিক হুমকির মুখে স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখছে। তারা প্রতিদিনের সতর্কতা সংকেতের সঙ্গে মানিয়ে নেয়, এবং ভবিষ্যতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করে। এই মানবিক গল্পগুলো যুদ্ধের কাঁচা বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বকে উজ্জ্বল করে তুলছে।



