জাপান ও ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার ম্যানিলায় একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে চীনের আঞ্চলিক আধিপত্যের মোকাবেলায় যৌথ পদক্ষেপের সূচনা করেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগি এবং ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ) শীর্ষক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য যৌথ প্রশিক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় সরবরাহের বিনিময় সহজতর করা।
চুক্তিতে উভয় দেশ জরুরি পরিস্থিতিতে একে অপরকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামের করমুক্ত বিনিময়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্বাক্ষরের পর দুই দেশের প্রতিনিধিরা যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, জরুরি মুহূর্তে তারা পারস্পরিক সহায়তা করবে এবং সমন্বিত প্রস্তুতি বজায় রাখবে।
এই চুক্তি ম্যানিলার একটি যৌথ ব্রিফিংয়ে উন্মোচিত হয়, যেখানে লাজারো উল্লেখ করেন যে, এই সহযোগিতা ফিলিপিন্সের সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলায়ও সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে, যা দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাম্প্রতিক সময়ে টোকিও ও ম্যানিলা সামরিক সম্পর্ক জোরদার করার ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। জাপান ইতিমধ্যে ফিলিপিন্সকে টহল বোট এবং রেডিও গিয়ার সরবরাহ করেছে এবং টোকিও থেকে ৬০ লক্ষ ডলারের সরকারি নিরাপত্তা সহযোগিতা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপগুলো চীনের সামুদ্রিক দখল ও আক্রমণাত্মক নীতির প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া হচ্ছে, যা দক্ষিণ চীন সাগরে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিপিন্স এবং চীনের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরের সেকেন্ড থমাস শোলে দ্বীপকে কেন্দ্র করে বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এই অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করতে ফিলিপিন্সের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশও ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন প্রকাশ করেছে। জাপানের এই নতুন উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে জাপানের প্রভাব বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপিন্সের সঙ্গে সামরিক জোট ‘স্কোয়াড’ গঠন করে, যা তাইওয়ানের নিরাপত্তা ও চীনের আক্রমণাত্মক নীতি রোধের উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়। জাপান ও ফিলিপিন্স উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোটের সদস্য, যা তাদের যৌথ কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করে। দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগত বিরোধের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি জাপানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি ও ফিলিপিন্সের কূটনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়কে প্রতিফলিত করে।
গত নভেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি শিন্জো চীনের তাইওয়ান‑সংক্রান্ত নীতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা প্রদান করেন এবং চীনের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে জাপান চুপ থাকবে না বলে উল্লেখ করেন। চীনের প্রতিক্রিয়ায় টোকিওকে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সাময়িকভাবে প্রশমিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে জাপান ও ফিলিপিন্সের সামরিক চুক্তি উভয় দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চুক্তির বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হবে; প্রথমে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্থাপন করা হবে, এরপর জরুরি অবস্থায় দ্রুত সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা হবে। উভয় দেশ এই সহযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখার পরিকল্পনা করেছে, যাতে চীনের আক্রমণাত্মক নীতি ও দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা মোকাবেলায় সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গঠন করা যায়।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, এই চুক্তি জাপানকে এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার কৌশলগত উপস্থিতি শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে এবং ফিলিপিন্সের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও দৃঢ় করবে। একই সঙ্গে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা বজায় থাকবে, তবে জাপান ও ফিলিপিন্সের সমন্বিত পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



