টিকটক-এ কাজ করা যুক্তরাজ্যের কন্টেন্ট মডারেটররা শ্রমিক আদালতে একটি আইনি দাবি দায়ের করেছে, কারণ তারা অভিযোগ করছে যে কোম্পানি ইউনিয়ন গঠনকে বাধা দিতে কর্মী ছাঁটাই করেছে। প্রায় চারশত মডারেটর ক্রিসমাসের আগে চাকরি থেকে বাদ পড়ে, যখন তারা সমবায় চুক্তি গঠনের ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এই মডারেটররা উল্লেখ করেছে যে তাদের কাজ উচ্চ মানসিক চাপের, যেখানে শিশু যৌন নির্যাতন, যুদ্ধ, গুলিবিদ্ধ দৃশ্য এবং মাদক ব্যবহার সংক্রান্ত ভিডিওর সঙ্গে নিয়মিত মোকাবিলা করতে হয়। তারা দাবি করে যে ট্রমাটিক কন্টেন্ট দ্রুত প্রক্রিয়া করার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে, তাই কাজের পরিবেশে অতিরিক্ত সুরক্ষা, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং কাজের সময়ের সীমা নির্ধারণের দাবি করে।
মডারেটররা যুক্তি দিয়েছে যে টিকটক তাদের অবৈধভাবে বরখাস্ত করেছে এবং যুক্তরাজ্যের শ্রমিক আইন লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে, তারা বলছে যে কোম্পানি সমবায় চুক্তি গঠনের ভোটের এক সপ্তাহ আগে কর্মী ছাঁটাই করে, যা ইউনিয়ন গঠনকে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্য নির্দেশ করে। এই সময়ে মডারেটরদের সমবায় স্বীকৃতির জন্য একটি ভোট নির্ধারিত ছিল।
টিকটক এই অভিযোগকে অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে ছাঁটাইগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক কন্টেন্ট মডারেশন সিস্টেমে রূপান্তরের অংশ। কোম্পানি জানিয়েছে যে বর্তমানে প্রায় ৯১ শতাংশ অনুপযুক্ত কন্টেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনাক্ত ও মুছে ফেলা হয়, এবং মানবিক মডারেশন টিমের আকার হ্রাসের পেছনে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রয়েছে।
কোম্পানি আগস্ট মাসে একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, ঠিক যখন লন্ডনের অফিসে মডারেটররা ইউনিয়ন স্বীকৃতির জন্য সংগঠিত হচ্ছিল। শ্রমিক ইউনিয়ন কমিউনিকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের (CWU) টেকনোলজি বিভাগের জাতীয় কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে মানবিক মডারেশন টিমের হ্রাস এবং অপরিণত AI সিস্টেমের ব্যবহার কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরও জানান যে মডারেটরদের কাজের চাপ ইতিমধ্যে উচ্চ, বেতন কম, এবং তারা প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের দাবি করে।
উক্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে মডারেটররা অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের কাজের গুণমান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তারা দাবি করে যে বর্তমান সম্পদ সীমাবদ্ধতার মধ্যে অতিরিক্ত কাজের চাপ তাদের কাজের গুণমান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
টিকটকের প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছেন যে কোম্পানির পুনর্গঠন কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তিতে, শ্রমিকদের সংগঠনমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তারা উল্লেখ করেছে যে AI-ভিত্তিক মডারেশন সিস্টেমের উন্নয়ন কন্টেন্ট সুরক্ষার গতি ও দক্ষতা বাড়াতে লক্ষ্য করা হয়েছে, এবং মানবিক মডারেশন টিমের হ্রাস কেবল খরচ সাশ্রয়ের জন্য নয়, বরং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের নির্ভরতা বাড়াতে।
যুক্তরাজ্যের শ্রমিক আদালতে দায়ের করা মামলাটি এখন বিচারাধীন, এবং উভয় পক্ষই তাদের যুক্তি উপস্থাপন করবে। যদি আদালত টিকটকের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এটি বড় টেক কোম্পানিগুলোর শ্রমিক অধিকার ও AI-র ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বদৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
এই বিষয়টি প্রযুক্তি শিল্পে মানবিক মডারেশন ও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের সমন্বয় নিয়ে চলমান বিতর্ককে তীব্র করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে অল্প সময়ে AI-তে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করা মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কর্মীদের কাজের শর্তে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত, টিকটকের এই পদক্ষেপ এবং শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া উভয়ই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা, কর্মী কল্যাণ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যে সমতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জকে উন্মোচিত করে। ভবিষ্যতে কিভাবে এই দ্বন্দ্ব সমাধান হবে তা শিল্পের নীতি ও নিয়মাবলীর উপর নির্ভরশীল, এবং এটি অন্যান্য বড় প্রযুক্তি সংস্থার জন্যও একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াবে।



