ঢাকার কেরানীগঞ্জে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি না পরিশোধের কারণে এক শিক্ষিকা ও তার স্বামীসহ দুই বোনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই রাত্রিতে শিক্ষার্থী জোবাইদা রহমান ও তার মা রোকেয়া রহমানের দেহ ফ্ল্যাটে পাওয়া যায়, যাদের মৃত্যু ঘটনার ২১ দিন পরই দেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, ২৫ ডিসেম্বর রাতে রোকেয়া ও তার মেয়ে জোবাইদা নিখোঁজ হয়ে যায়। পরের দিন রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহমেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানা‑এ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দাখিল করেন এবং পরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা দাখিল করেন।
সেই একই রাতে ৯৯৯ জরুরি নম্বরে কল পেয়ে থানা‑এর ওসি এম সাইফুল আলম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি জানান, শিক্ষিকা নুসরাত মীম (২৪) এক এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, যার জামিনদার ছিলেন রোকেয়া রহমান। কিস্তি না দিতে পারায় রোকেয়ার ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয় এবং দুজনের মধ্যে বহুবার তর্ক‑বিতর্ক হয়।
২৫ ডিসেম্বর বিকেলে জোবাইদার বোন ফাতেমা (১৫) নুসরাতের বাসায় পড়তে আসে। সেখানে ফাতেমা ও নুসরাতের ছোট বোন (১৫) মধ্যে তর্ক হয়, যার ফলে নুসরাতের বোন ফাতেমার গলা চেপে মেরে ফেলেন। পরে ফাতেমা তার মা রোকেয়ার গলাবন্ধে সহায়তা করেন।
ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে ফাতেমার পোশাক পরে নুসরাতের বোন বাসা থেকে বের হন, যাতে সিসিটিভি রেকর্ডে ফাতেমা নিজে চলে গেছেন বলে মনে হয়। দুই ঘণ্টা পরে নুসরাত রোকেয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলে, মেয়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে তাকে বাসায় আনতে আহ্বান করেন। রোকেয়া বাসায় প্রবেশের পর নুসরাতের বোন তাকে পেছন থেকে গলা চেপে ধরেন, পরে দুজন একসাথে রোকেয়াকে শ্বাসরোধে মেরে ফেলেন।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, হত্যার পর নুসরাতের পরিবার ২১ দিন পর্যন্ত দেহগুলো ফ্ল্যাটে রেখে বসবাস করে। শেষ পর্যন্ত ৯৯৯‑এ কলের পর থানা‑এর দল ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে দেহগুলো উদ্ধার করে। দেহের অবস্থান ও সময়ের পার্থক্য থেকে স্পষ্ট হয়, দেহগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাটে রাখা হয়েছিল।
গ্রেফতারকৃত নুসরাত মীম, তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮) এবং দুই বোন (১৫ ও ১১ বছর)কে থানা‑এ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে ঋণ‑সংক্রান্ত অপরাধ, হত্যা এবং দেহ লুকানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওসি সাইফুল আলম জানান, তদন্ত চলমান এবং পরবর্তী আদালত‑সামনে মামলার শোনানির তারিখ শীঘ্রই নির্ধারিত হবে।
পুলিশের মতে, এনজিও‑এর ঋণ‑নিয়ম অনুসারে কিস্তি না দিলে ঋণ‑দাতা সংস্থা রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত এই ভয়াবহ ঘটনার দিকে নিয়ে যায়। তদন্তে ঋণ‑দাতা সংস্থার ভূমিকা ও ঋণ‑নিয়মের বৈধতা যাচাই করা হবে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় সমাজে শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। নিকটস্থ বাসিন্দারা জানান, নুসরাতের পরিবার দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এবং এই ধরনের অপরাধের কোনো পূর্বধারণা ছিল না। তবে ঋণ‑সংক্রান্ত বিরোধের ফলে পরিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে, এ বিষয়ে স্থানীয় নেতারা সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
আসন্ন আদালত‑সামনে মামলার শোনানি, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ‑প্রসঙ্গ উপস্থাপন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটি দ্রুত সমাধান করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



