মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা জনগণের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগের বিরুদ্ধে তার প্রতিরক্ষা উপস্থাপন করেছে। মিয়ানমার প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং আদালতের বিচারকদের জানিয়ে বলেছেন যে গাম্বিয়ার উপস্থাপিত প্রমাণ অপর্যাপ্ত এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন। গাম্বিয়া সরকার ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও, এখন পর্যন্ত তারা যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে তা যথেষ্ট নয় বলে মিয়ানমার দাবি।
গাম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী দাওদা জাল্লো আদালতে উল্লেখ করেন যে মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের নির্মূলের লক্ষ্যে “জেনোসাইড নীতি” অবলম্বন করেছে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে সামরিক দমনমূলক অভিযান চলাকালে হাজারো রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং প্রায় সাত লক্ষ মানুষ বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে পলায়ন করে। এই ঘটনার পরপরই জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে মিয়ানমারের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের রাখাইন রাজ্যে জেনোসাইড এবং অন্যান্য অঞ্চলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।
মিয়ানমার ২০২১ সালে সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকে দেশটি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। সরকার ধারাবাহিকভাবে দাবি করে যে তার সামরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দমন করা, রোহিঙ্গা জনগণ নয়। কো কো হ্লাইং আদালতে জোর দিয়ে বলেন, “মিয়ানমারকে নিষ্ক্রিয় থেকে রোহিঙ্গা বসবাসকারী উত্তর রাখাইনকে সন্ত্রাসীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়”। তিনি “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” শব্দটি ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করেন যে এই অভিযানগুলো কন্ট্রা-ইনসার্জেন্সি ও কন্ট্রা-টেরর অপারেশন হিসেবে চালু করা হয়েছে।
গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার সময় উল্লেখ করে যে, তার নিজ দেশের সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দাওদা জাল্লো আদালতে রোহিঙ্গা জনগণের দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন, মানবিক মর্যাদা হ্রাসকারী প্রচার এবং পরবর্তীতে সামরিক দমনকে “নিরন্তর জেনোসাইড নীতি” হিসেবে বর্ণনা করেন, যা তাদের অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে চায়।
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা রোহিঙ্গা নারীর, শিশুর এবং বয়স্কদের হত্যাকাণ্ড, পাশাপাশি গ্রামগুলোর ধ্বংসকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরেন। তারা যুক্তি দেন যে এই ধরনের অপরাধের কোনো বৈধতা নেই এবং আন্তর্জাতিক আদালতে কঠোর শাস্তি প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আইসিজে-তে এই মামলাটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গাম্বিয়া প্রমাণের যথার্থতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য জেনোসাইড মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা যদি সফল হয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জেনোসাইড সংক্রান্ত আইনি কাঠামোতে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।
আইসিজে-তে মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আদালত উভয় পক্ষের লিখিত যুক্তি পর্যালোচনা করবে এবং শীঘ্রই মৌখিক যুক্তি শোনার তারিখ নির্ধারণ করবে। এই প্রক্রিয়ায় উভয় দেশের আইনজীবী দলকে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
মিয়ানমার সরকার জোর দিয়ে বলছে যে রোহিঙ্গা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, এবং এই পদক্ষেপগুলোকে “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে গাম্বিয়া এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে, দাবি করে যে সামরিক দমনজনিত অপরাধকে নিরাপত্তা উদ্বেগের নামে আড়াল করা যায় না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই মামলাকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছে। তারা আইসিজের রায়কে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ ও মিয়ানমারের মানবাধিকার নীতির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
মিয়ানমারের সামরিক শাসন এবং গাম্বিয়ার মানবিক দায়িত্ববোধের মধ্যে এই আইনি লড়াই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের রায় দেয়, তবে তা মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।
অন্যদিকে, মিয়ানমার যদি তার প্রতিরক্ষা সফলভাবে উপস্থাপন করে, তবে গাম্বিয়া ও অন্যান্য মানবাধিকার সমর্থক গোষ্ঠীর জন্য আইনি পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই পরীক্ষা করবে।
সর্বশেষে, আইসিজে-তে চলমান এই মামলাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে থাকবে, যেখানে জেনোসাইডের সংজ্ঞা, প্রমাণের মানদণ্ড এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নগুলো পুনরায় আলোচিত হবে।



