ঢাকার উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনে শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও, উদ্ধারকৃত ১৬ জনের মধ্যে ছয়জনের প্রাণ হারিয়ে গেছেন। মৃতদের মধ্যে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দড়িপাঁচাশি গ্রাম থেকে আসা তিনজন পরিবারিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত, যাদের মধ্যে বাবা ও দুই সন্তান একসাথে নিহত হয়েছে।
মৃত ব্যক্তিরা হলেন হাফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে হিসান উদ্দিন রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা (১৪)। রোদেলা হারিছের ছোট ভাই শহীদুল ইসলামের মেয়ে, ফলে দুজনের পরিবার একসাথে উত্তরায় ফলের ব্যবসা করে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল।
অগ্নিকাণ্ডে শহীদুল ইসলাম, তার স্ত্রী শিউলী আক্তার এবং চার বছর বয়সী ছেলে উমর উদ্দিন গুরুতর আঘাত পেয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, আগুন দ্বিতীয় তলায় শুরু হয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাকি তিনজনের মধ্যে কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ের কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের দুই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২) অন্তর্ভুক্ত। এদেরও একই সময়ে আগুনে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
দ্রুত পদক্ষেপে ফায়ার সার্ভিস ১৬ জনকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠায়। তবে শোকের ছায়া পুরো গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে দড়িপাঁচাশি গ্রামে যেখানে মৃতদের পরিবার বাস করত। গ্রামবাসী এবং আত্মীয়স্বজনেরা দুঃখভরে কাঁদছে, এবং মৃতদের দেহ বাড়িতে না পৌঁছলেও দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা সমবেত হয়ে শোক প্রকাশ করছে।
দ্রুতই দড়িপাঁচাশি গ্রামে তিনটি কবর পাশে পাশে খোঁড়া হয়, যেখানে বাবা-ছেলেসহ একই পরিবারের তিনজনের দাফন হবে। স্থানীয় বাসিন্দা রবিন হোসেন জানান, পুরো গ্রাম এই দুঃখজনক ঘটনার জন্য শোকময় পরিবেশে নিমজ্জিত।
মৃতদের চাচা নজরুল ইসলাম শোক প্রকাশ করে বলেন, “হারিছ উদ্দিন খুবই দয়ালু মানুষ ছিলেন, এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কল্পনাও করা কঠিন। বাবা-ছেলেসহ তিনজনের একসাথে মারা যাওয়ায় পরিবারটি অপ্রতিম ক্ষতির মুখে।”
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ণয়ের জন্য ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্ট এবং ভবনের নিরাপত্তা রেকর্ড সংগ্রহ করছে। এছাড়া, ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস লাইন এবং অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কর্মকর্তা জানান, ভবনের অগ্নি সুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না এবং জরুরি বেরিয়ে আসার পথ সীমিত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ভবনের মালিক ও ব্যবস্থাপনা সংস্থাকে ভবনের নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।
পুলিশের তদন্তে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো অপরাধমূলক কাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তবে অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালু করা হয়েছে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে এবং আহতদের জন্য অতিরিক্ত মেডিকেল সহায়তা নিশ্চিত করেছে। আহতদের পরিবারকে মানসিক সহায়তা ও পরামর্শ সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
শুক্রবার রাত ১০টায় দাফন কার্য সম্পন্ন হবে, যেখানে মৃতদের পরিবার এবং গ্রামবাসী উপস্থিত থাকবে। দাফনের পর, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ভবনের নিরাপত্তা মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।



