উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার লস্ট কোস্টের নিচে একটি অদৃশ্য টেকটোনিক টুকরা সনাক্ত করা হয়েছে, যা উত্তর আমেরিকা টেকটোনিক প্লেটের তলদেশে চিপচিপে আটকে আছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই টুকরাটি সম্ভবত ১৯৯২ সালের মেনডোসিনো অঞ্চলের ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে। গবেষণার ফলাফল জানুয়ারি ১৫ তারিখে বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক দল মাইক্রো‑সিসমিক কার্যকলাপ, অর্থাৎ অতি ক্ষুদ্র ও প্রায় অদৃশ্য ভূকম্পন ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ জটিল ফল্টের মানচিত্র তৈরি করেছে। এই ক্ষুদ্র কম্পনগুলো ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড করা হলে, ভূত্বকের গঠন ও অদৃশ্য টুকরার অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়। গবেষকরা এই পদ্ধতিকে “মাইক্রো‑সিসমিক টোমোগ্রাফি” বলে ডাকে, যা গভীর স্তরের অস্বাভাবিকতা উন্মোচনে বিশেষ কার্যকর।
লস্ট কোস্টের শান্ত ও অপ্রবেশ্য দৃশ্যের নিচে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চলগুলোর একটি অবস্থিত। এখানে সান অ্যান্ড্রেস ফল্ট এবং ক্যাসকেডিয়া সাবডাকশন জোনের সংযোগস্থল রয়েছে, যেখানে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সীমানা একত্রিত হয়। এই সংযোগস্থলকে মেনডোসিনো ট্রিপল জাংশন বলা হয়, যেখানে উত্তর আমেরিকা প্লেট ও প্যাসিফিক প্লেট পার্শ্বিকভাবে স্লাইড করে, আর ছোট গর্ডা প্লেট উত্তর আমেরিকা প্লেটের নিচে ডুবে যায়।
১৯৯২ সালের মে মাসে মেনডোসিনো উপকূলে ৭.২ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প ঘটেছিল, যা বহু ভবন ও সড়ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ভূমিধস ও সামান্য সুনামি সৃষ্টি করে। বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবে, ঐ ভূমিকম্পের হাইপোসেন্টার মাত্র প্রায় দশ কিলোমিটার গভীরতায় ছিল, যা গর্ডা প্লেটের সাবডাকশন জোনের সাধারণ গভীরতার তুলনায় অল্পই। এই অস্বাভাবিক গভীরতা বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছিল যে, ভূকম্পনের উৎস কী হতে পারে।
প্রাথমিক ব্যাখ্যায় কিছু গবেষক “স্ল্যাব গ্যাপ” ধারণা উপস্থাপন করেন, যেখানে একটি শ্যালো স্পেস গঠিত হয় যখন একটি প্লেট অন্যটির ওপর ঘর্ষণ করে এবং ম্যান্টল থেকে ম্যাগমা উঠে এসে কম্পন সৃষ্টি করে। তবে এই তত্ত্বের ব্যাখ্যা সব পর্যবেক্ষণকে সমন্বয় করতে পারেনি, বিশেষ করে কম্পনের তীব্রতা ও গভীরতার পার্থক্য।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মেনডোসিনো ট্রিপল জাংশনের নিচে একটি পৃথক টেকটোনিক টুকরা রয়েছে, যা উত্তর আমেরিকা প্লেটের তলদেশে চিপচিপে আটকে আছে। এই টুকরাটি গর্ডা প্লেটের সাবডাকশন স্ল্যাবের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র অংশ হিসেবে উপস্থিত। গবেষকরা অনুমান করছেন, এই টুকরার হঠাৎ স্লিপ বা ভাঙ্গন ১৯৯২ সালের ভূমিকম্পের মূল কারণ হতে পারে।
এই আবিষ্কার টেকটোনিক প্লেটের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে এবং ভবিষ্যতে ভূকম্পন পূর্বাভাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাইক্রো‑সিসমিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখলে, এমন অদৃশ্য টুকরার গতিবিধি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সময়মতো শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীরা এখন এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সিসমিক সেন্সর স্থাপন এবং ভূগর্ভস্থ মডেল আপডেটের পরিকল্পনা করছেন।
উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ও নিকটবর্তী অঞ্চলের জনগণকে এই ফলাফল সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং স্থানীয় সিসমিক সতর্কতা ব্যবস্থা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এমন টেকটোনিক টুকরা কীভাবে ভূকম্পনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া উচিত। আপনি কি মনে করেন, এই ধরনের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ আমাদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত?



