মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডকে দখল করার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় জনগণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ন্যুক, গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী, যেখানে শীতের তীব্রতা ও বরফের স্তর বাড়ছে, সেখানে এই রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
শীতের শেষের দিকে ন্যুকের রাস্তায় ঘন বরফের স্তর গড়িয়ে গিয়েছে, পাহাড়ের ঢালগুলো কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তীব্র আর্কটিক বাতাসে মানুষজন কাঁপছে। এই পরিবেশে ট্রাম্পের দখল হুমকি শীতের সঙ্গে মিশে অতিরিক্ত উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ে ওঠার পর, গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিক তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ তাদের সংবিধানগত অধিকার ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতি অবহেলা নির্দেশ করে।
স্থানীয় শিক্ষক সিমোনে বাগাই বলেন, “তিনি সংবিধানগত অধিকার ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতি কোনো সম্মান দেখাননি। গ্রিনল্যান্ড আমাদের এবং আমরা চাই না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ জায়গা দখল করুক। আমরা এ বিষয়ে বারবার সভ্যভাবে জানিয়েছি।” তার কথায় স্পষ্ট যে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
বাগাই আরও যোগ করেন, “বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলা তার জন্যই কঠিন ছিল, কিন্তু ট্রাম্পের রূঢ় বক্তব্যে মানুষের উদ্বেগ প্রকাশ করার প্রয়োজন রয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, শীতের কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও জনগণকে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য সক্রিয় হতে হবে।
ন্যুকের পৌর প্রকৌশলী লুডভিগ পিটারসেনের মতে, “আমরা কখনও চাইনি আমেরিকার অংশ হই। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার বেসরকারীকরণ এখানে মানিয়ে নেওয়ার মতো নয়। ট্রাম্প আমাদের জোর করে দখল করতে চাইলে আমি সত্যিই ভীত।” তিনি দেশের সামাজিক কাঠামোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন।
পিটারসেনের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে গ্রিনল্যান্ডের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্বতন্ত্রতা, যা বেসরকারিকরণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নেটকে দুর্বল করবে।
একজন ইনুইট ট্যাক্সি চালকও একই উদ্বেগ ভাগ করে নেন। তিনি বলেন, “আমাদের ঐতিহ্যগত জীবন, যেমন সীল শিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার ৩৮টি কুকুরও ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।” তার কথায় গ্রিনল্যান্ডের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও ঐতিহ্যবাহী জীবনের ক্ষয় স্পষ্ট হয়।
ট্যাক্সি চালকের মতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে, যা গ্রিনল্যান্ডের জনগণের জীবনের মৌলিক দিককে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের ফলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সীলচামড়ার পোশাক ব্যবসায়ী মিয়া কেমনিটজও একই সুরে মন্তব্য করেন, “যখন আমরা গ্রিনল্যান্ডের কথা বলি, আমরা আমাদের মানুষ, পরিবার ও সমাজের কথা বলি। কিন্তু বাইরের বিশ্বের আলোচনায় সব সময় এটি শুধু ভূখণ্ড ও সম্পদের ব্যাপার। আমরা একে অপরের কথা বোঝাই না।” তিনি গ্রিনল্যান্ডের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্পদ নয়, মানবিক মূল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
কেমনিটজ আরও যোগ করেন, “আমরা শান্তিপ্রিয়। কখনও যুদ্ধ করিনি। আমাদের কোনো সামরিক বাহিনী নেই। তাই কেউ আমেরিকান সেনা বাহিনীকে প্রতিহত করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা জরুরি।” তার কথায় গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নীতির সীমাবদ্ধতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রকাশ পায়।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, ট্রাম্পের দখল হুমকি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার নতুন মোড় আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত আলোচনার ফলাফল এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া পরস্পরকে প্রভাবিত করবে। পরবর্তী ধাপে গ্রিনল্যান্ডের সরকারী প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়টি উত্থাপন করতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হুমকির তীব্রতা নির্ধারণ করবে।
এই সময়ে গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা। স্থানীয় নেতারা এবং সাধারণ মানুষ একত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো জোরপূর্বক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে প্রস্তুত, যাতে ভবিষ্যতে শান্তি ও স্বনির্ভরতা বজায় থাকে।



