ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি – জুলাই ২০২৩-এ গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় বাম ও মধ্যপন্থী তরুণদের উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ) আজ শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনজন মুখপাত্র ও ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই পদক্ষেপের পেছনে জুলাই ২০২৩-এ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের দাবি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করা।
এনপিএর মুখপাত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ফেরদৌস আরা রুমী, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত। রুমী ও তুহিন খান উভয়ই লেখক ও সামাজিক কর্মী, আর নাজিফা জান্নাত পূর্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের ভূমিকা হল প্ল্যাটফর্মের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দেওয়া এবং জনমত গঠনকে সমর্থন করা।
কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ১০১, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগকারী চারজন প্রাক্তন নেতা অন্তর্ভুক্ত। এই চারজন হলেন অনিক রায় (পূর্বে এনসিপি যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক), তুহিন খান (পূর্বে যুগ্ম সদস্যসচিব), সৈয়দা নীলিমা দোলা (পূর্বে কালচারাল সেল উপপ্রধান) এবং সৈয়দ ইমতিয়াজ নদভী (পূর্বে এনসিপি সদস্য)। তাদের অংশগ্রহণ এনপিএকে বিদ্যমান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে।
কাউন্সিলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অলিউর সান, ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সভাপতি বাকী বিল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ, এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রাক্তন সহসমন্বয়ক নূমান আহমাদ চৌধুরী ও রাফসান আহমেদ। এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক ক্ষেত্র থেকে সমর্থন এনে এনপিএকে বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মুখপাত্ররা এনপিএর ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে প্ল্যাটফর্মের পাঁচটি মূল নীতি উল্লেখ করা হয়েছে: গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। এই নীতিগুলোকে ভিত্তি করে এনপিএ দেশের রাজনৈতিক সংস্কার, নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে চায়।
ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রামের উল্লেখ করা হয়েছে এবং জুলাই ২০২৩-এ ঘটিত জনসাধারণের আন্দোলনকে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই সময়ের দাবি ছিল শাসন কাঠামোর ফ্যাসিবাদী দিক ভেঙে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের দাবি করে। এনপিএ এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে পুনরায় জোর দিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করতে চায়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা এনপিএকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক মঞ্চে তরুণ ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে এই প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন। এছাড়া, এনপিএর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় স্থানীয় স্তরে শাখা গঠন, নীতি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এনপিএকে বিদ্যমান দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, এনপিএর মূল নীতি ও কাঠামো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ভোটারদের মধ্যে নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র করতে পারে। তবে, নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠা ও সংগঠনগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
এনপিএর প্রতিষ্ঠা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। আগামী মাসগুলোতে প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম, নীতি প্রস্তাবনা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি কীভাবে এগোবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে এনপিএ তার কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ, জনমত সংগ্রহ এবং সামাজিক আন্দোলন সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।



