ইরানের রাজধানী তেহরানে গত সপ্তাহে শুরু হওয়া প্রতিবাদগুলো, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন পরবর্তী সময়ে দৃশ্যত থেমে গেছে। প্রতিবাদগুলো ২৮ ডিসেম্বর মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিবেশের কঠোরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে জনসমাবেশ কমে যাওয়া দেখা গেছে।
ইরানীয় কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেংগাওর মতে, গত রবিবারের পর থেকে কোনো বৃহৎ প্রতিবাদ সংগঠিত হয়নি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, পূর্বে প্রতিবাদে জড়িত শহর ও গ্রামগুলোতে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনকি যেখানে বড় প্রতিবাদ হয়নি সেসব এলাকাতেও একই রকম দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
তেহরানের কিছু বাসিন্দা জানান, শহরের আকাশে ড্রোনের উপস্থিতি বাড়ছে এবং গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে কোনো প্রতিবাদ চিহ্ন দেখা যায়নি। ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের ফলে তথ্য প্রবাহ সীমিত থাকলেও, শহরের সাধারণ পরিবেশ শান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি, বিশেষ করে দমনমূলক কার্যক্রমে প্রাণহানি বাড়লে তা নিয়ে ছিল। তবে বুধবারের পরে ট্রাম্পের দল জানায়, দমনমূলক কাজের তীব্রতা কমে যাওয়ায় সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট উল্লেখ করেন, ট্রাম্প পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে “গুরুতর পরিণতি”ের সতর্কতা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ইরানে নির্ধারিত ৮০০টি মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরীতা স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট সব বিকল্প বিবেচনা করছেন।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের পটভূমিতে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার, এই সপ্তাহে ওয়াশিংটন সঙ্গে তীব্র কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে চায়, কারণ তা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইরানের সরকার, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ধর্মীয় নেতাদের হাতে রয়েছে, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মুদ্রাস্ফীতির মুখে জনমতকে দমন করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
প্রতিবাদগুলো মূলত মুদ্রাস্ফীতির তীব্রতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের ওপর ভিত্তি করে ছিল। অর্থনৈতিক সংকটের ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, যা সামাজিক অশান্তির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ইন্টারনেটের ব্যাপক বন্ধের ফলে দেশের অভ্যন্তরে তথ্যের প্রবাহ কঠিন হয়ে পড়েছে, তবে কিছু স্বতন্ত্র সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের চলাচলও সীমিত হয়েছে। তেহরানের কিছু এলাকায় নিরাপত্তা গার্ডের চেকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে এবং জনসাধারণের সমাবেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
হেংগাওর সংস্থা উল্লেখ করেছে, তাদের স্বাধীন সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি শুধু পূর্বে প্রতিবাদে জড়িত শহরগুলোতেই নয়, অন্যান্য শহর ও গ্রামেও ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের ফলে ইরানের সরকার সাময়িকভাবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখবে, তবে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আবার প্রতিবাদ পুনরায় জ্বলে উঠতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা উন্মোচন করে।



