গতকাল বৃহস্পতিবার, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাপ্তাহিক সংবাদসভার মাধ্যমে জানিয়েছে যে, ভারতের সেনা প্রধানের জেলামুক্ত জঙ্গলে সন্ত্রাসী ক্যাম্পের উপস্থিতি সম্পর্কে করা অভিযোগ ভিত্তিহীন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির হুসেইন আন্দ্রাবি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আজাদ কাশ্মীরের কোনো অংশে সন্ত্রাসী শিবিরের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। এই বিবৃতি ভারতের সামরিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
ভারতীয় সেনা প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী, গত মঙ্গলবার, অপারেশন সিন্দুরের পর ফলাফল হিসেবে, লাইন অব কন্ট্রোল (LoC) বরাবর অন্তত ছয়টি সক্রিয় সন্ত্রাসী ক্যাম্পের অস্তিত্বের দাবি করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই শিবিরগুলো সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গোপনভাবে কাজ করছে এবং নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করছে। এই দাবিটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ইতিমধ্যে তীব্র উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অপারেশন সিন্দুর, যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাম্প্রতিক সীমান্ত অভিযান, তার লক্ষ্য ছিল সীমান্তে সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম দমন করা। দ্বিবেদী এই অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করেন যে, শিবিরগুলো এখনও কার্যকর এবং সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তিনি এই বিষয়টি নিরাপত্তা নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
পাকিস্তানি মুখপাত্রের মতে, উপেন্দ্র দ্বিবেদীর উল্লিখিত দাবিগুলো সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন এবং কল্পনাপ্রসূত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ডে কোনো সন্ত্রাসী ক্যাম্পের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ভারতীয় পক্ষের এই অভিযোগ কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বহন করে। এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
অধিকন্তু, পাকিস্তান সরকার দাবি করে যে, ভারতের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা কুলভূষণ যাদব গোপনভাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ধ্বংসাত্মক কাজ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং এ বিষয়ে তাদের কাছে সরকারি নথি রয়েছে। এই তথ্যটি ভারতীয় পক্ষের পূর্ববর্তী নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ এবং দুই দেশের মধ্যে তথ্যের পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছে।
তাহির হুসেইন আন্দ্রাবি উপেন্দ্র দ্বিবেদীর উক্তিগুলোকে “অদ্ভুত, অভ্যাসগত ও কিছুটা বিভ্রান্তিকর” বলে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন ধরনের দাবিগুলো কেবলমাত্র উত্তেজনা বাড়ায় এবং বাস্তব নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে না। এই মন্তব্যটি কূটনৈতিক ভাষায় ভারতীয় দাবির অযৌক্তিকতা তুলে ধরেছে।
পাকিস্তান একই সময়ে তার সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান বহু বছর ধরে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা বন্ধ করতে কাজ করে আসছে এবং এই প্রচেষ্টা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। এই স্বীকৃতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অধিকন্তু, পাকিস্তান তার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দেন যে, লাইন অব কন্ট্রোলের দুই পাশে অবস্থিত সেনাবাহিনীর উপস্থিতি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা সত্ত্বেও উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব সমস্যার মূল কারণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সংলাপের মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানায়।
লাইন অব কন্ট্রোল, যা ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং পাকিস্তান শাসিত আজাদ কাশ্মীরকে পৃথক করে, দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত অবস্থানকে নির্ধারণ করে। এই সীমান্তে নিয়মিত গুলিবর্ষণ ও ছোটখাটো সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মন্তব্যগুলো এই সংবেদনশীল এলাকায় নতুন উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের পারস্পরিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো পুনরায় সক্রিয় করা এবং সম্ভাব্য ত্রৈমাসিক নিরাপত্তা সংলাপের আয়োজন করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উভয় দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতা প্রস্তাব করতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে দু’দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।



