বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে; কাজ‑করার‑বয়সের (১৫‑৬৪) জনসংখ্যা প্রায় দুই‑তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ত্বরান্বিত সম্ভাবনা তৈরি করে। এই সুযোগকে প্রথম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়, যেখানে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত বাড়ার ফলে উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি পায়। তবে এই সুবিধা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে হলে কর্মশক্তি স্বাস্থ্যকর এবং উৎপাদনশীলভাবে নিয়োজিত হতে হবে।
জাতীয় স্থানান্তর হিসাব (NTA) অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রথম ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ লাভ অর্জনের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, কারণ নির্ভরশীলতার অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বনিম্নে পৌঁছাবে বলে বিশ্বজনসংখ্যা পূর্বাভাস (২০২৪ সংস্করণ) উল্লেখ করেছে। এই সময়সীমা দেশের জন্য একটি অনন্য অর্থনৈতিক সুযোগ উপস্থাপন করে, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রমবাজার, আর্থিক ও সামাজিক নীতি এবং শাসনব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমানে যুব বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, এবং অর্ধেকেরও বেশি তরুণ কর্মী আংশিক বা অনানুষ্ঠানিক কাজের মধ্যে আটকে আছে। এই পরিস্থিতি মূলত শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবের ফলে সৃষ্টি হয়েছে; উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চমূল্যের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কম। ফলে স্নাতকরা এমন চাকরির জন্য প্রস্তুত নয়, যা ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদনশীল সেক্টরগুলোকে চালিত করবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দক্ষতা ঘাটতি শ্রমের গুণগত মানকে হ্রাস করে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়ায় এবং উৎপাদন খরচ বাড়ায়। শিল্প ও সেবা খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী না থাকলে নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীরগতি পায়, আর রপ্তানি সক্ষমতা সীমিত হয়। একই সঙ্গে, অপ্রতুল দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী কম বেতনে কাজ করে, যা ভোক্তা ব্যয়ের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস করে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের অবস্থা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা; কর্মশক্তির স্বাস্থ্যকর অবস্থান না থাকলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং রোগজনিত অনুপস্থিতি বাড়ে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, তবে যুবক ও মধ্যবয়সী কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখনও পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্যকর মানবসম্পদ ছাড়া ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করা কঠিন।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার রূপান্তর অপরিহার্য; পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত বিষয় যুক্ত করা, ভোকেশনাল ট্রেনিংকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশযোগ্যতা বাড়াতে গ্রামীণ ও নগর উভয় অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মস্থল স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং বীমা কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শ্রমবাজারে ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নীতিগুলোকে আধুনিকায়ন করে কর্মীদের আয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত।
যদি এই সংস্কারগুলো সময়মতো এবং সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ ২০৪৫ সালের আগে গড়ে ৬‑৭ শতাংশের চেয়ে বেশি বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, যা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে, সংস্কার বিলম্বিত হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা হারিয়ে যাবে, বেকারত্বের চাপ বাড়বে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে।
সারসংক্ষেপে, প্রথম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে সরকার, ব্যবসা সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম নীতি এবং শাসনব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার জরুরি। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া এই সুযোগকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়; অন্যথায় দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থাকবে।



