লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এখনও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান, যা দেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) যৌথ সমীক্ষা অনুসারে, ১৫ বছর ও তার ঊর্ধ্বে বয়সী ৭৬% বিবাহিত নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন; এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯%, গত বছরে একই ধরণের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ক্ষমতায় বিশ্বে সপ্তম স্থানে পৌঁছেছিল, তবে এই সাফল্য নারীদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি।
মহিলা নেতাদের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক পদে থাকা সত্ত্বেও, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার মূল কারণকে দুইটি ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়: সামাজিক-নিয়মগত ক্ষেত্র এবং শাসন কাঠামো। প্রথমটি সমাজের গভীর সংস্কৃতিগত গঠনকে নির্দেশ করে, যেখানে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও প্রধান ভূমিকা পালন করে।
সামাজিক স্তরে নারীদের প্রায়ই পুরুষ-প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়; ঐতিহাসিকভাবে সমাজে তাদের উপস্থিতি স্বীকৃত হলেও, সাম্প্রতিক দশকে তারা নাগরিক অধিকার থেকে বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীদেরকে ‘পশ্চিমা-প্রভাবিত’ এবং ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে, যা তাদেরকে অধিকারহীন ও প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলেছে।
এ ধরনের ধারণা সহিংসতার মোকাবিলায় আইনি সুরক্ষার অভাবকে বাড়িয়ে দেয়। সমাজে নারীদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপরাধের প্রতি কম মনোযোগের ফলে সহিংসতার শিকার নারীরা ন্যায়বিচার পেতে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে যে পারিবারিক সহিংসতা শুধু গৃহস্থালিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে ঘটছে। ফলে নারীরা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বাংলাদেশে ২০১০ সালের গৃহহিংসা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন প্রণয়ন করা হলেও, বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং সামাজিক স্বীকৃতির অভাবের কারণে এর কার্যকারিতা সীমিত রয়ে গেছে। আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও, শাসন ব্যবস্থার পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাব সহিংসতার হার কমাতে বাধা সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতি দেশের মানবসম্পদকে অর্ধেকের বেশি অংশের সম্ভাবনা নষ্ট করে। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও যৌন-গৃহস্থালি সহিংসতা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাধা সৃষ্টি করে।
অতএব, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমাজের সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও শাসন কাঠামোর উভয় দিকেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক ধারণা ভাঙা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগকে ত্বরান্বিত করা জরুরি।
সরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নীতি নির্ধারকরা যদি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তবে ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।
সারসংক্ষেপে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সমাজের গভীর গঠন ও শাসন ব্যবস্থার দুটো স্তরে সমাধান না করা পর্যন্ত দেশের সমগ্র উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে রয়ে যাবে। নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম মূল চাবিকাঠি, যা এখনই কার্যকর নীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন।



