যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল-এর মধ্যে চলমান তর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নীতি নির্ধারণের সীমা। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর থেকে তিনি ফেডকে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার জন্য এবং সরকারি ঋণের খরচ বাড়ানোর জন্য সমালোচনা করছেন, এবং একই সঙ্গে ব্যাংকের শীর্ষ নীতিনির্ধারক লিসা কুককে পদচ্যুত করার চেষ্টা করেছেন, যা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে।
আর্জেন্টিনার প্রাক্তন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান মার্টিন রেড্রাডোর অভিজ্ঞতা এই যুক্তিকে নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়। রেড্রাডো ২০১০ সালে তখনকার প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা কির্চনার আদেশে দেশের রিজার্ভের অংশ বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পর পদচ্যুত হন। তিনি এই সিদ্ধান্তের বৈধতা রক্ষা করতে আদালতে লড়াই করেন, তবে অবশেষে বাড়তি চাপের মুখে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
রেড্রাডোর বিরোধের পরিণতি আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রারম্ভিক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। রিজার্ভের স্বায়ত্তশাসন হ্রাসের ফলে মুদ্রাস্ফীতি তীব্র হয় এবং মুদ্রার মান হ্রাস পায়, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই অভিজ্ঞতা আজ ট্রাম্পের ফেডের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা পুনরায় প্রশ্নের মুখে।
ট্রাম্পের ফেডের প্রতি আক্রমণমূলক রূপরেখা ২০২২ সালের শেষের দিকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি পাবলিকভাবে পাওয়েলকে অর্থনীতির সঠিক পরিচালনা না করার এবং সুদের হার অতিরিক্ত উচ্চ রাখার অভিযোগ করেন, যা সরকারী ঋণের ব্যয় বাড়াচ্ছে। তবে তার সমালোচনা শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি ব্যাংকের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের দিকে অগ্রসর হয়।
আগস্ট মাসে ট্রাম্প লিসা কুককে ফেডের শীর্ষ নীতিনির্ধারক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কুকের পদত্যাগের বৈধতা এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, যেখানে আদালত তার পদচ্যুতি সংবিধানিক সীমা অতিক্রম করেছে কিনা তা নির্ধারণ করবে। এই মামলাটি ফেডের স্বায়ত্তশাসন ও নির্বাহী শাখার ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
একই সময়ে পাওয়েল ফেডের ওপর ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের একটি অপরাধমূলক তদন্তের কথা জানিয়ে দেন, যা একটি সম্পত্তি সংস্কার প্রকল্পের ব্যয় অতিরিক্ত হওয়ার অভিযোগে শুরু হয়েছে। পাওয়েল এই তদন্তকে রাজনৈতিক প্রেরণার ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে বলে খণ্ডন করেন এবং ফেডের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব না পড়ার আশ্বাস দেন।
বাজারের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে বিনিয়োগকারীরা ফেডের স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে এবং তার নীতি নির্ধারণে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের কুকের পদচ্যুতি সংক্রান্ত শুনানি এবং ট্রাম্পের পাওয়েলের পরিবর্তনের সম্ভাবনা এই স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করবে।
পাওয়েলের মেয়াদ মে মাসে শেষ হতে যাচ্ছে, এবং ট্রাম্পের নতুন ফেড চেয়ারম্যানের প্রস্তাবনা শীঘ্রই প্রকাশের প্রত্যাশা রয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানের নির্বাচন ফেডের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেড্রাডো বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার নিজের সময়ের মতোই একই ধরনের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি দেখছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ফেডের স্বায়ত্তশাসন যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
এই ঘটনাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি ও রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মোড় আনতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ট্রাম্পের নতুন ফেড চেয়ারম্যানের নির্বাচন উভয়ই ফেডের স্বায়ত্তশাসনকে পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা রাখে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে ফেডের নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাত্রা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কীভাবে সংরক্ষিত হবে, তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে।



