কক্সবাজারের নুনিয়াছটা এলাকায় মারিয়া রে ২০২২ সালে স্টারিনাস কিচেন নামে একটি রেস্টুরেন্ট চালু করেন। পর্যটন মৌসুমে মাসিক পাঁচ লাখ টাকার বিক্রয় অর্জন করা রেস্টুরেন্টটি মূলত সি‑ফুড ও সামুদ্রিক মাছের বিভিন্ন পদ পরিবেশন করত। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী তিনি সি‑উইড ও শৈবাল ভিত্তিক স্যুপসহ বিশেষ খাবার যোগ করেন, যা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
রেস্টুরেন্টের সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে মারিয়া স্থানীয়ভাবে শৈবাল সংগ্রহ করে তা থেকে শুকনা গুঁড়া ও শৈবাল সাবান উৎপাদন শুরু করেন। ২০২৫ সালে এই পণ্যগুলোর বিক্রয় থেকে প্রায় দুই লাখ টাকার আয় হয়। শৈবালের বহুমুখী ব্যবহার দেখার পর তিনি একই বছর নভেম্বর নুনিয়াছটা এলাকায় প্রায় দেড় একর জমিতে শৈবাল চাষের কাজ শুরু করেন।
চাষকৃত শৈবালের প্রধান প্রজাতি হল উলভা (Ulva) ও গ্র্যাসিলারিয়া (Gracilaria)। শীতকালে সমুদ্র তীরে পাওয়া গ্র্যাসিলারিয়া শৈবালকে বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর উলভার বীজ কক্সবাজার কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়। মোট ছয়টি পরিবারের নারী সদস্য এই চাষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শৈবাল চাষের জন্য সমুদ্রের লবণাক্ততা ও মৌসুমী আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, ফলে চাষের মৌসুম নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। প্রতি মাসে শৈবাল সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হয়। বর্তমান মৌসুমে মারিয়া প্রায় ২৪ টন উলভা শৈবাল এবং অতিরিক্ত দুই টন শুকনা শৈবাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। গ্র্যাসিলারিয়া শৈবালের উৎপাদন প্রায় ৫০০ কেজি হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিমাণের ভিত্তিতে তিনি মোট তিন মিলিয়ন টাকার বিক্রয় প্রত্যাশা করছেন।
উৎপাদিত শৈবাল অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘Sea Forest BD’ এর মাধ্যমে ফেসবুক ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিক্রি করা হয়। শৈবালকে অ্যান্টি‑অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি‑এজিং গুণাবলি, ভিটামিন ও খনিজের সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, ফলে তা সুপারফুডের মর্যাদা পেয়েছে। পাশাপাশি শৈবাল জৈব সার, পশু খাদ্য, তাজা খাবার, পাউডার, নির্যাস, প্রসাধনী ও ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এই বহুমুখিতা স্থানীয় ও রপ্তানি বাজারে চাহিদা বাড়াতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সামুদ্রিক শৈবালের চাহিদা বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর খাবার ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে গ্রাহকের ঝোঁক বাড়ছে। মারিয়ার ব্যবসা এই প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা ও উচ্চ মূল্য নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শৈবাল চাষের জন্য লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও জলপ্রবাহের পরিবর্তন ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যায়; অপ্রত্যাশিত মৌসুমী পরিবর্তন উৎপাদন হ্রাসের কারণ হতে পারে। এছাড়া শৈবাল প্রক্রিয়াকরণে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন, যা বিনিয়োগের অতিরিক্ত খরচ বাড়াতে পারে।
মারিয়া রে উল্লেখ করেছেন, শৈবালের পুষ্টিকর গুণাবলি বিশেষত আয়োডিনের ঘাটতি পূরণে ও নারীর স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক। এই দিকটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করে। ভবিষ্যতে তিনি শৈবালকে আরও মূল্য সংযোজন পণ্য—যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল এক্সট্র্যাক্ট ও প্রিমিয়াম কসমেটিক্স—এ রূপান্তর করার পরিকল্পনা করছেন, যা উচ্চ মার্জিনের ব্যবসা হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, মারিয়া রের শৈবাল উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত টেকসইতা সংযোজনের একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মৌসুমী পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রক্রিয়াকরণে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই শর্তে ব্যবসা বৃদ্ধি পেলে কক্সবাজারের সামুদ্রিক সম্পদকে মূল্যায়ন করার নতুন পথ খুলে যাবে।



