ইরানের বিভিন্ন শহরে চলমান বিরোধী প্রতিবাদে এক কানাডীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে, যা কানাডা সরকার ১৫ জানুয়ারি নিশ্চিত করেছে। ঘটনাটি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে কানাডীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং তা তিনি সদ্য জানেন। তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর করা সহিংসতার কঠোর নিন্দা জানিয়ে ইরান সরকারকে অবিলম্বে ‘ইচ্ছাকৃত সহিংসতা’ বন্ধ করার আহ্বান জানান।
কানাডার কনস্যুলার কর্মীরা মৃত ব্যক্তির পরিবারকে জানাতে যোগাযোগ শুরু করেছে, তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। অনিতা আনন্দের মতে, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য ইরানকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলতে হবে।
ইরানের পাশাপাশি গ৭ (G7) দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একত্রে নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তারা ইরানি কর্তৃপক্ষকে সংযম বজায় রাখতে এবং অতিরিক্ত সহিংসতা না বাড়াতে আহ্বান জানিয়ে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে তবে তেহরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ বা কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের প্রতিবাদকারীদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, দেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করেছেন এবং ইরানের নীতি পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলেছেন।
ইরানি সরকার এই বিশৃঙ্খলার পেছনে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি উসকানি ও সহায়তা প্রদানকারী হিসেবে উল্লেখ করে, দেশের অস্থিরতা ও অরাজকতার মূল কারণ হিসেবে এই দেশগুলোকে দেখিয়েছেন।
বিক্ষোভার সূচনা ৮ জানুয়ারি মুদ্রার দরপতনের প্রতিবাদে হয়েছিল। অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দাবিও মিশে, প্রতিবাদ দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের মধ্যে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করা, সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা এবং সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ, গুলির ব্যবহার এবং গুলিবিদ্ধদের সংখ্যা বাড়ার ফলে ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডে নতুন আঘাত লেগেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তবে ইরান সরকার এখনও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছুক।
কানাডি নাগরিকের মৃত্যুর পর কানাডা ও তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন স্তরে পৌঁছেছে। কানাডা ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কিছু বিষয় স্থগিত করেছে এবং ইরানকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়বদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
গ৭ দেশগুলোর যৌথ বিবৃতি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার বন্ধ করার পাশাপাশি, ইরানকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি মেনে চলতে এবং নাগরিকদের মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানায়। ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
ইরান সরকার, যদিও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে, দেশীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অশান্তি বিদেশি হস্তক্ষেপের ফল, এবং তাই তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকে আরও বাড়বে। কানাডা, গ৭ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত নিন্দা ইরানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াতে পারে, এবং ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে।



