ইরানের সরকার গত বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ইন্টারনেট ও ফোন সেবা বন্ধ করে, ফলে ৯২ মিলিয়ন নাগরিকের সংযোগ কেটে যায়। এই বন্ধটি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলেছে এবং বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ১৭০ ঘণ্টারও বেশি স্থায়ী হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই ইন্টারনেট বন্ধটি দেশের ইতিহাসে তৃতীয় দীর্ঘতম, পূর্বে ২০১৯ সালে ১৬৩ ঘণ্টা এবং ২০২৫ সালে ১৬০ ঘণ্টা বন্ধের রেকর্ড ছিল। এই রেকর্ডের পরেও, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুদানের ইন্টারনেট বন্ধ ৩৫ দিন (প্রায় এক মাস) এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মরিতানিয়ার বন্ধ ২২ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।
নেটব্লকসের গবেষণা পরিচালক ইসিক মাটের উল্লেখ করেন, ইরানের বন্ধটি জনসংখ্যার ব্যাপক অংশকে প্রভাবিত করার দিক থেকে সবচেয়ে কঠোর এবং ব্যাপক বন্ধগুলোর একটি। তিনি বলেন, দেশের সমগ্র জনগণই এই বন্ধের শিকার হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য পরিস্থিতি অনুসরণ করা কঠিন করে তুলেছে।
ডিজিটাল অধিকার সংস্থা AccessNow-র গবেষক জ্যাক রসনও জানান, তাদের তথ্য অনুযায়ী ইরানের বর্তমান বন্ধটি ইতিহাসের দশটি দীর্ঘতম বন্ধের তালিকায় প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইন্টারনেট বন্ধের সময়কাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গতিবিধি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ইরানের সরকার পূর্বে বহুবার প্রতিবাদ ও অশান্তির সময় ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ সীমিত করেছে। এই পদ্ধতি নাগরিকদের সংগঠন ও প্রতিবাদ সমন্বয়কে কঠিন করে তুলতে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অনুমান করে, দেশের বিভিন্ন শহরে ৬০০টিরও বেশি প্রতিবাদ হয়েছে, এবং এই দমনের ফলে অন্তত ২,০০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
প্রতিবাদগুলো শেষ বছরের শেষের দিকে শুরু হয় এবং দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে, ইন্টারনেট বন্ধটি জনসাধারণের অশান্তি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপকে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করছেন।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, ইন্টারনেট বন্ধের দীর্ঘায়ু দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলবে। তথ্যের প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর প্রতিবাদ বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়তে পারে, যা ইরানের নীতি ও মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর অতিরিক্ত scrutiny আনবে।
ইন্টারনেট বন্ধের বর্তমান অবস্থা এবং এর সম্ভাব্য সমাপ্তি সময় সম্পর্কে সরকার কোনো স্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি। তবে, দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরের পর্যবেক্ষকরা প্রত্যাশা করছেন যে, যদি এই বন্ধ দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তবে তা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, ইরানের নাগরিকদের জন্য বিকল্প যোগাযোগের উপায় সীমিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের জন্য চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে কীভাবে সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



