সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও আইনজীবী সুলতানা কামাল বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর ১৯৯০ সালে গঠিত টাস্কফোর্সের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি না করার অভিযোগ তুলেছেন। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস, ১৯৯০ সালের টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য ছিলেন, তবে সুলতানা কামাল জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে তিনি সেই টাস্কফোর্সের কোনো কাজ সম্পন্ন করেননি।
সুলতানা কামাল প্রশ্ন তোলেন, “১৯৯০ সালে গঠিত টাস্কফোর্সের অন্যতম নেতা ছিলেন আজকের প্রফেসর ইউনূস। তিনি সেই টাস্কফোর্সের কোন কাজটি এখন করেছেন?” এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়নহীনতা এবং বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণে তার ভূমিকা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
কামাল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিগুলো দলগুলো শোনার পরেও বাস্তবে রূপ নেয় না, এ নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দলগুলো জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলেও সেই বোধ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এবং জনগণকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেখানে তারা নিজেদের অধিকার ও স্বার্থের প্রতি অবহেলিত বোধ করে।
তিনি আরও বলেন, “আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের বিচ্ছিন্নতা। আমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। সরকার জানে না নাগরিক কারা, আর নাগরিকরা জানে না সরকার কে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি নাগরিক-সরকারের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের গভীরতা তুলে ধরেছেন।
সুলতানা কামাল উল্লেখ করেন, কাদের সঙ্গে কী পরামর্শ করতে হবে, সেই বোঝাপড়া নেই এবং এভাবে একটি জাতি চলতে পারে না। তিনি এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য স্পষ্ট পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন, যা না থাকলে নীতি-নির্ধারণে গ্যাপ বাড়বে।
১৯৯০ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর, অর্থনীতি ও প্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একাধিক টাস্কফোর্স গঠিত হয়। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের উদ্যোগে মোট ২৯টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যেখানে ২৫৫ জন বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব অংশগ্রহণ করেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসও সেই টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন। এই টাস্কফোর্সগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করা।
সুলতানা কামালের এই সমালোচনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা সরকারকে টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। বিশেষ করে, যদি সরকার এই সুপারিশগুলোকে পুনরায় সক্রিয় না করে, তবে জনমত ও বিরোধী দলের সমালোচনা তীব্র হতে পারে।
অধিকন্তু, ড. ইউনূসের বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা পদে থাকা সত্ত্বেও টাস্কফোর্সের কাজের অগ্রগতি না হওয়া, তার নীতিগত দায়িত্বের প্রতি প্রশ্ন তুলতে পারে। সিপিডি’র মতো নীতি সংস্থাগুলোর সদস্যদের এই ধরনের প্রকাশনা নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার জন্য নতুন তদারকি প্রক্রিয়া গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সুলতানা কামাল শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করেন, “একটি জাতি চলতে পারে না যদি পরামর্শের পথ পরিষ্কার না থাকে।” তার এই মন্তব্য সরকারকে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে নীতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করে। ভবিষ্যতে, যদি সরকার টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়ন না করে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক বাড়তে পারে এবং জনমতের অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
এই সমালোচনা দেশের নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নাগরিক-সরকারের সম্পর্ক এবং টাস্কফোর্সের কাজের ফলপ্রসূতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে। সরকার যদি এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেয়, তবে টাস্কফোর্সের সুপারিশের বাস্তবায়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক-প্রশাসনিক সংস্কারকে নতুন দিক দিতে পারে। অন্যথায়, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নীতি-নির্ধারণে অগ্রগতির অভাবের সমালোচনা বাড়তে থাকবে।



