১৩ ও ১৪ জানুয়ারি ঢাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ও নেপালের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের ৮ম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পক্ষ থেকে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপাল পক্ষ থেকে ড. রাম প্রসাদ ঘিমির নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। সভার মূল লক্ষ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করা।
সভার উদ্বোধনে উভয় দেশের বাণিজ্য সচিবরা বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার আশাবাদী হন। তারা উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সংযোগের ভিত্তি দৃঢ় এবং তা ধারাবাহিকভাবে উন্নত হবে।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর বিশদ আলোচনা হয়। বিশেষ করে পণ্য রপ্তানি‑ইম্পোর্টের পরিমাণ বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর উপায়গুলো নিয়ে মতবিনিময় হয়।
পর্যটন উন্নয়ন, বিমান সংযোগের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিষয়েও আলোচনা করা হয়। উভয় পক্ষ লোডেড ডেভেলপিং কান্ট্রি (LDC) থেকে উত্তরণ‑পরবর্তী টেকসই উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব দেয়। এছাড়া বাংলাদেশ‑নেপাল‑ভারত ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার সম্ভাবনাও উত্থাপিত হয়।
প্রধান বাণিজ্য চুক্তি (PTA) চূড়ান্ত করার বিষয়টি সভার অন্যতম অগ্রাধিকার। উভয় পক্ষ ড্রাফট টেক্সট, রুলস অব অরিজিন এবং পণ্যের তালিকা দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেয়। চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রবাহকে ত্বরান্বিত করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়।
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (MoU) গুলোর বাস্তবায়ন বিষয়েও সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য শেয়ারিং এবং সমন্বিত কাজের মাধ্যমে চুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে।
ব্যবসায়িক ভিসা, পেশাজীবী ও তাদের পরিবারের ভিসা এবং পর্যটন ভিসা সহজীকরণের জন্য উভয় দেশ একমত হয়। ভিসা প্রক্রিয়ার স্বল্পীকরণ বাণিজ্যিক মিশন, বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকদের চলাচলকে সহজ করবে, ফলে বাণিজ্য ও পর্যটন আয় বৃদ্ধি পাবে।
পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানো, পেমেন্ট সিস্টেম সরলীকরণ এবং নির্ভরযোগ্য লেনদেন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার জন্যও সম্মতি হয়। এই পদক্ষেপগুলো বাণিজ্যিক লেনদেনের ঝুঁকি কমিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করবে।
নন‑ট্যারিফ বাধা হ্রাস, পণ্যের মান পরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সম্ভাবনাময় পণ্যের জন্য বিশেষ প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগ পণ্য রপ্তানি বাড়িয়ে উভয় দেশের উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ একমত হয়। তারা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনিয়োগ চুক্তি এবং যৌথ প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে।
সরকারি ও বেসরকারি স্তরে ট্রেড ফেয়ার, প্রদর্শনী এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময়ও আলোচনার বিষয় ছিল। এই ধরনের ইভেন্টগুলো বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সমঝোতা গুলো বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে নেপালকে নতুন গন্তব্য হিসেবে স্থাপন করবে এবং নেপালের জন্য বাংলাদেশকে প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে রূপান্তরিত করবে। বিশেষ করে কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প, টেক্সটাইল এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবা উভয় দেশের জন্য লাভজনক সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিনিয়োগের দিক থেকে, সহজ ভিসা নীতি এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে সহায়ক হবে। এয়ারলাইন সংযোগের সম্প্রসারণ ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নতি দু’দেশের পর্যটন আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে বলে আশা করা যায়।
তবে, বাণিজ্যিক সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য কাস্টমস প্রক্রিয়া সমন্বয়, মান নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ডের সামঞ্জস্য এবং পেমেন্ট গেটওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই বিষয়গুলোতে দেরি হলে চুক্তির প্রত্যাশিত প্রভাব কমে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ৮ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভা বাংলাদেশ‑নেপাল বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছে। উভয় দেশ ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা, বাণিজ্যিক পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার জন্য যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।



