মাইক্রোসফট এবং ভারতের স্টার্ট‑আপ ভারাহা ২০২৪ সালের শেষের দিকে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যার মাধ্যমে মাইক্রোসফট আগামী তিন বছর, ২০২৯ পর্যন্ত ১০ লক্ষ টনের বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড অপসারণ ক্রেডিট ক্রয় করবে। এই চুক্তি এশিয়ায় মাইক্রোসফটের প্রথম ধরনের কার্বন অপসারণের লেনদেন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, ভারাহা প্রতি বছর প্রায় ৩৩,৩৩৩ টন ক্রেডিট সরবরাহ করবে, যা মোট ১০ লক্ষ টনের বেশি হবে। এই ক্রেডিটগুলো সরাসরি মাইক্রোসফটের গ্লোবাল কার্বন হ্রাস লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
এশিয়ায় প্রথমবারের মতো এই ধরনের লেনদেনের গুরুত্ব এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং তার ফলে বাড়তে থাকা শক্তি ব্যবহার ও নির্গমনের সঙ্গে যুক্ত। এআই সেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড অবকাঠামোর শক্তি খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত হ্রাসের উপায় খুঁজতে বাধ্য করছে।
ভারাহা পরিকল্পনা করেছে যে, তুলা ফসলের অবশিষ্ট বর্জ্য, যা ফসল কাটার পর প্রায়ই পুড়িয়ে ফেলা হয়, তা থেকে বায়োচার উৎপাদন করা হবে। বায়োচার হল এক ধরনের কাঠকয়লা সমজাতীয় পদার্থ, যা মাটিতে মিশিয়ে দিলে দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্বন সংরক্ষণ করে এবং একই সঙ্গে খোলা মাঠে জ্বালানী পোড়ার ফলে সৃষ্ট বায়ু দূষণ কমায়।
প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজের কেন্দ্র হবে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের মহারাষ্ট্র রাজ্য, যেখানে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৪৫,০০০টি ক্ষুদ্র কৃষক অংশগ্রহণ করবে। এই কৃষকরা তুলা ফসলের অবশিষ্টাংশ সরবরাহ করবে, যা বায়োচার উৎপাদনের মূল কাঁচামাল হবে।
মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেকে কার্বন‑নেগেটিভ কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানির মোট গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০২০ সালের তুলনায় ২৩.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রধান কারণ হল ক্লাউড ও এআই সেবার মান বৃদ্ধি থেকে উদ্ভূত মান‑শৃঙ্খলা নির্গমন।
মাইক্রোসফট এখনও ২০২৫ সালের কার্বন হ্রাসের অগ্রগতি প্রকাশ করেনি, যা বিনিয়োগকারীদের এবং পরিবেশগত বিশ্লেষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্যের প্রত্যাশা বাড়িয়ে তুলেছে।
বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো এআই চালিত সেবার দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বাড়তে থাকা শক্তি চাহিদা এবং নির্গমন মোকাবিলায় কার্বন অপসারণ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে, বিশেষত এশিয়ার বাজারে সুযোগ অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করছে।
ভারত এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ দেশের বিশাল কৃষি অবশিষ্টাংশ এবং বিস্তৃত কৃষক সম্প্রদায়ের কারণে বড় পরিসরে বায়োচার উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া, কৃষি-ভিত্তিক কার্বন অপসারণ প্রকল্পগুলো স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশগত সুবিধা প্রদান করে।
ভারাহা ১৮টি শিল্প রিঅ্যাক্টর স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছে, যা প্রত্যেকটি ১৫ বছরের জন্য চালু থাকবে। এই রিঅ্যাক্টরগুলো সম্পূর্ণ কার্যকর হলে প্রকল্পের মোট জীবদ্দশায় ২ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড অপসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
কার্বন অপসারণ বাজারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হল কেবল যন্ত্রপাতি স্থাপন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্যভাবে চালনা করা এবং ক্রেডিট জারি প্রক্রিয়ার কঠোর মানদণ্ড মেনে চলা। ভারাহা এই দুইটি দিকেই দক্ষতা প্রদর্শন করে, যা স্কেল‑এ ক্রেডিট সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টের এশিয়ায় প্রথম বড় চুক্তি স্থানীয় কার্বন অপসারণ শিল্পের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে। এটি অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানিকে একই ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য উদ্দীপনা দিতে পারে, ফলে বৈশ্বিক কার্বন ক্রেডিটের চাহিদা বাড়বে। তবে রিঅ্যাক্টরের দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষকদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা এবং ক্রেডিটের বাজারমূল্য স্থিতিশীলতা ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে।
সংক্ষেপে, মাইক্রোসফটের ভারাহার সঙ্গে চুক্তি এশিয়ায় কার্বন অপসারণের বাণিজ্যিক মডেলকে দৃঢ় করতে পারে, একই সঙ্গে ভারতীয় কৃষি-ভিত্তিক বায়োচার শিল্পের স্কেল‑আপে ত্বরান্বিত করবে। ভবিষ্যতে এআই চালিত শক্তি চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের প্রকল্পের গুরুত্ব আরও বাড়বে, তবে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং ক্রেডিটের স্বচ্ছতা বজায় রাখা সফলতার মূল চাবিকাঠি হবে।



