ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি‑বিদ্যুৎ খসড়া মহাপরিকল্পনা (২০২৬‑২০৫০) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়েছেন, সরকার এই পরিকল্পনা কোনো পরামর্শ বা বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণ ছাড়া গোপনে প্রস্তুত করেছে, যা পূর্বের সরকারের স্বচ্ছতা‑বিহীন পদ্ধতির স্মরণ করিয়ে দেয়।
সিপিডি উল্লেখ করে, অন্তর্বর্তী সরকার যখন জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা তৈরি করেছে, তখন তা দ্রুত এবং তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সন্দেহ উত্থাপিত হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, তবে সিপিডি এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিল না, যা সংস্থার জন্য অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
গবেষণা পরিচালক অতীতের সরকারের সময়ে সিপিডি যে বৈষম্যমূলক পরিবেশে কাজ করেছিল, তা সবাই জানে, তিনি বলেন। বর্তমান সরকারের সঙ্গে কিছুটা সহযোগিতা থাকলেও, এই ধরনের গোপনীয় পরিকল্পনা তৈরি করা পূর্বের স্বৈরাচারী পদ্ধতির প্রতিফলন বলে তিনি সমালোচনা করেন।
মোয়াজ্জেম প্রশ্ন তোলেন, কেন এই মহাপরিকল্পনার মিশন‑ভিশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যথাযথ স্থান নেই। তিনি উল্লেখ করেন, পরিকল্পনায় রিসোর্স অপটিমাইজেশন নামে অভ্যন্তরীণ কয়লা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যদিও বৈশ্বিক প্রবণতা পরিষ্কার শক্তির দিকে অগ্রসর।
এছাড়া, পরিকল্পনায় সোলার শক্তির নাম ব্যবহার করে অন্যান্য কার্বন নির্গমনকারী জ্বালানি উৎসকে সোলারের অন্তর্ভুক্তিতে যুক্ত করা হয়েছে, যা নীতি দিক থেকে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বিষয়গুলো নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
খসড়া পরিকল্পনায় ২০৫০ সালের জন্য মোট বিদ্যুৎ ক্ষমতা ৬০,০০০ মেগাওয়াটের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে সিপিডি যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছে, তাতে দেখা যায় দেশের প্রকৃত চাহিদা প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০,০০০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। অতিরিক্ত ক্ষমতা পরিকল্পনা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে অপ্রয়োজনীয় হতে পারে।
লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামোর ব্যাপক বিনিয়োগের কথাও পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে। পূর্বের মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ৩.৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় অনুমোদিত ছিল, যেখানে বর্তমান খসড়ায় এই সংখ্যা ২৭ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ধরনের বিশাল আর্থিক ব্যয়, বিশেষ করে যখন নবায়নযোগ্য শক্তির অংশীদারিত্ব কম, তা নীতি নির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। মোয়াজ্জেমের মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছেও সন্দেহ উত্থাপন করতে পারে।
সিপিডি উল্লেখ করে, এমন একটি পরিকল্পনা যা বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া গোপনে তৈরি হয়, তা স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নীতির বিরোধিতা করে। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান, পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে এবং বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে ক্ষমতা নির্ধারণ করতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই খসড়া পরিকল্পনা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, কারণ এটি পরবর্তী নির্বাচনী সময়ে শক্তি নীতি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত করতে পারে। সিপিডির মন্তব্যের পর সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পরবর্তী ধাপে, সিপিডি আশা করে যে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরিকল্পনাটির পুনঃমূল্যায়ন করবে। এভাবে না হলে, খসড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবেশগত ক্ষতি এবং জনমত বিরোধের মুখোমুখি হতে পারে।



