চট্টগ্রামের জিমনেসিয়াম সংলগ্ন মাঠে ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, জুলাই সনদে ১৯৭১ সালের ইতিহাস মুছে ফেলা বা ধর্মীয় শব্দ বাদ দেওয়ার কোনো ধারা নেই বলে স্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি উল্লেখ করেন, সনদটি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গুজবের কোনো ভিত্তি নেই।
আলী রীয়াজ, যিনি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের সমন্বয়ক, বলেন, কিছু গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ধরনের ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জুলাই সনদে একাত্তরকে মুছে ফেলা বা ধর্মীয় কোনো উপাদান বাদ দেওয়ার বিষয়টি কখনোই আলোচনার তালিকায় আসেনি।
প্রতিপক্ষের কিছু কণ্ঠস্বরের মতে, সনদে সংবিধান থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখ সরিয়ে ফেলা এবং ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দ বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রীয়াজের মতে, এই দাবিগুলি সম্পূর্ণ ভুল এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। তিনি উল্লেখ করেন, সনদটি হাজারো মানুষের রক্তের দানে গড়ে উঠেছে এবং তা রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের পবিত্র দায়িত্ব।
রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সনদের বিষয়টি আলোচনা করা উচিত এবং যে কেউ যদি বিরোধী যুক্তি উপস্থাপন করতে চান, তার জন্য শোনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এমন আলোচনা যুক্তিসঙ্গত, শান্তিপূর্ণ এবং গঠনমূলক হওয়া উচিত, যাতে দেশের উন্নয়নের পথে কোনো বাধা না আসে।
ফ্যাসিবাদের পতনের পর বাংলাদেশে একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, এ কথায় রীয়াজের দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি অন্যান্য দেশের সফল গণভোটের উদাহরণ তুলে ধরে, বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের শক্তিবৃদ্ধি সম্ভব হবে।
রীয়াজ আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জুলাই সনদই একমাত্র কার্যকর উপায়। তিনি অতীতের ১৭টি সংবিধান সংশোধনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে সমালোচনা করেন এবং বর্তমান সনদকে জনগণের ভোটাধিকার ও হিস্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।
সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত ও প্রতিনিধিত্বমূলক করবে। রীয়াজের মতে, এই পদক্ষেপটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে এবং জনমতকে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিফলিত করবে।
সম্মেলনে উপস্থিত ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা রীয়াজের বক্তব্যে সম্মতি জানিয়ে, সনদের গুরুত্ব ও দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে এর ভূমিকা স্বীকার করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় বিষয়কে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রেখে, দেশের উন্নয়নের জন্য একসাথে কাজ করা দরকার।
অন্যদিকে, কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী এখনও সনদের কিছু ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জনসাধারণের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করে। তারা দাবি করে, সনদে ধর্মীয় স্বতন্ত্রতা হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও রীয়াজের মতে, সনদে কোনো ধর্মীয় উপাদান বাদ দেওয়ার ধারা নেই।
এই বিতর্কের মধ্যে সরকারী পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট: জুলাই সনদ দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে আধুনিকায়ন করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে। সরকার ইতিমধ্যে সনদের প্রচার ও জনসচেতনতায় বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে ভোটাররা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আসন্ন গণভোটের প্রস্তুতি চলাকালীন, রীয়াজ এবং অন্যান্য বিশ্লেষকরা ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছেন। তারা বিশ্বাস করেন, সনদে স্বাক্ষর করে দেশটি বিচারিক স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের পথে অগ্রসর হবে।
সম্মেলনের সমাপ্তিতে রীয়াজ সকল অংশগ্রহণকারীকে সনদের সঠিক তথ্য প্রচার ও গুজবমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে কোনো ভুল তথ্যের কারণে গণতন্ত্রের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



