ঢাকা – ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট কেন্দ্রের ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভর্তি করা হয়েছিল। সিলমার কাজ রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৩টা পর্যন্ত চলেছিল। এই প্রক্রিয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, যখন তখনকার আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, যিনি পরে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন, তাকে ‘রাতের ভোট’ করার পরামর্শ দেন।
কমিশনের ৩২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনের পূর্বে, একই সপ্তাহের সোমবার, এটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করা হয়। পাঁচ সদস্যের কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম এই তদন্তে অংশ নেন।
কমিশনের অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্যায়ে, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) একটি ‘স্পেশাল সেল’ গঠন করে, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল। এই সেলটি নির্বাচনের সকল ধাপের তদারকি, হস্তক্ষেপ এবং পরিচালনা নিশ্চিত করার দায়িত্বে ছিল। সেলটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাই ও বদলি, এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভেটিংসহ বিস্তৃত কাজের তত্ত্বাবধান করত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, তারা রাতের ভোটের জন্য সিল মেরে রাখার কাজ সম্পন্ন করেছেন। এই স্বীকারোক্তি কমিশনের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে এবং তা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্তের সময়, কমিশন তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন—২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪—এর অনিয়ম বিশ্লেষণ করে একটি কমিটি গঠন করে, যা পরে পূর্ণাঙ্গ কমিশনে রূপান্তরিত হয়। এই কমিটি নির্বাচনের সময়কালে বিভিন্ন সংস্থার হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে নিরাপত্তা গোপনীয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাত্রা নির্ণয়ে কাজ করে।
কমিশনের সদস্যরা উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাচনের সময়কালে নিরাপত্তা সংস্থার ‘নির্বাচন সেল’ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে ব্যালেটের সিলমার কাজ রাতের সময়ে সম্পন্ন হওয়ায়, স্বচ্ছতা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রতিবেদনের প্রকাশের পর, সরকারী পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে নির্বাচনী সংস্কারের দাবিকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নতুন আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষয় করেছে। তারা নির্বাচন কমিশনকে স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত করার এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ‘নির্বাচন সেল’ এবং রাতের ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। যদি এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তবে তা নির্বাচনী আইনের পুনর্গঠন, নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা সীমিত করা এবং ভোটারদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অধিকন্তু, এই বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার হ্রাস পেতে পারে। তাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর উন্নয়নে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



