ইরানের উত্তেজনা বাড়ার মাঝখানে প্রথম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রতিবাদকারী এরফান সুলতানির ফাঁসির সময়সূচি অস্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী সুলতানি, কারাজ শহরের একটি পোশাকের দোকানে কর্মরত, গত বৃহস্পতিবারের প্রতিবাদে অংশগ্রহণের পর গ্রেপ্তার হন এবং বুধবারের নির্ধারিত ফাঁসির আগে কারাগার কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয় যে কার্যক্রমটি এখনো চালু করা হবে না।
গ্রেপ্তারের পর থেকে সুলতানির শারীরিক অবস্থার সংক্ষিপ্ত তথ্য ছাড়া পরিবারের কাছে কোনো আপডেট আসে নি। একই দিন, কারাগার থেকে ফোনে জানানো হয় যে ফাঁসির সময়সূচি অস্থায়ীভাবে স্থগিত করা হয়েছে, তবে পুনরায় কখন কার্যকর হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
সুলতানির পরিবারের একজন ৪৫ বছর বয়সী সদস্য, যিনি বিদেশে বসবাস করেন, তিনি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানান যে তারা কারাগারে গিয়ে তাকে দেখেছেন এবং দুই দিন ধরে ঘুমাতে পারছেন না। তিনি বলেন, “এরফানকে নিয়ে চিন্তা থামাতে পারছি না; অনিশ্চয়তা আমাদেরকে ভেঙে দিয়েছে। কীভাবে এমন এক তরুণের ঘাড়ে দড়ি বাঁধা সম্ভব?” এই উদ্বেগের মধ্যে পরিবার ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে, কারণ ইরানে সাধারণত প্রার্থনার সময়ের আগে ফাঁসির কাজ সম্পন্ন করা হয়।
সুলতানি ইরানের প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রতীকী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে আরও অনেক মানুষ একই ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নরওয়ের হেঙ্গাও মানবাধিকার সংস্থা উল্লেখ করেছে যে সুলতানিকে কোনো আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ বা আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়নি।
গত দুই সপ্তাহে ইরানে ১৮,০০০ের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে এবং অন্তত ২,৫৭১ জন নিহত হয়েছে। এই প্রতিবাদগুলি ২৮ ডিসেম্বর মুদ্রার হঠাৎ পতনের পর শুরু হয় এবং দ্রুত রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের কঠোর দমন নীতি এবং দ্রুত মৃত্যুদণ্ড প্রদানকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করছেন।
অ্যামনেসি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইরানকে সুলতানি এবং অন্যান্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রতিবাদীদের ফাঁসির সময় স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে ইরান প্রায়শই কয়েক মিনিটের ট্রায়ালে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। সুলতানির ক্ষেত্রে, গ্রেপ্তারের মাত্র চার দিন পরই মৃত্যুদণ্ড আরোপ করা হয়, যা সংস্থাগুলো ‘ন্যায়বিচারের অধিকার হরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা ইরানের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ ইতিমধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিত্তিতে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে, ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শাসক রাষ্ট্র, এই ঘটনাকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ার সংকেত হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরানের সরকারী মুখপাত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্যে বলা হয়েছে যে দেশীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “ইরানের মানবাধিকার রেকর্ডের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের দরজা খুলে যাবে।”
পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ফাঁসির পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে স্পষ্টতা না পাওয়া পর্যন্ত সুলতানির পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীরা অনিশ্চয়তায় আটকে থাকবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইরানের আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য তৎপরতা দাবি করছে।
এই ঘটনাটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে ইরান এই চাপ মোকাবেলা করবে এবং তার প্রতিবাদ নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।



