নাটোর জেলার মাছ ব্যবসায়ীরা এখন প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ মেট্রিক টন তাজা, জীবন্ত মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দিচ্ছেন। দুই দশক আগে ফরমালিনের ব্যবহার ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে গ্রাহকরা বাজারে মাছ কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক ছিলেন; আজকের দিনে পুকুরের সরাসরি তাজা মাছের সরবরাহে ভোক্তাদের আস্থা ফিরে এসেছে।
নাটোরের বিস্তৃত পুকুর, চ্যানেল ও বিলের নেটওয়ার্কে বছরে প্রায় ১,০০,০০০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয় বলে জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, যদিও বাস্তবে এই পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে পারে। উৎপাদনের পরিমাণ স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি, ফলে অতিরিক্ত মাছকে অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি করা হচ্ছে।
১৯৯৮ সালের আগে, যমুনা সেতু উদ্বোধনের পূর্বে, ফরমালিন ব্যবহার করে মাছকে বরফজাত করে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হতো। এই পদ্ধতিতে দাম কমে যেত এবং বড় অংশে মাছ নষ্ট হয়ে যেত। ২০০০ সাল থেকে ব্যবসায়ীরা পুকুর থেকে সরাসরি জীবন্ত মাছ ট্যাঙ্কে ভর্তি ট্রাকে লোড করে, চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার বাজারে পৌঁছে দিচ্ছেন।
ট্রাকের ট্যাঙ্কে পানি ভরাট থাকায় মাছের তাজা অবস্থা বজায় থাকে এবং পরিবহন সময়ে ক্ষতি কমে। ফলে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছানো মাছের গুণমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং তাজা মাছের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালিতে তাজা মাছের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে।
প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৫০০ ট্রাক, প্রত্যেকটি প্রায় এক টন ক্ষমতায়, নাটোর থেকে বিভিন্ন জেলায় রওনা হয়। এই লজিস্টিক্সের ফলে স্থানীয় চাষিদের পরিবহন ব্যয় কমে এবং মাছের নষ্ট হওয়ার হার হ্রাস পায়। ব্যবসায়ীরা এখন সরাসরি পুকুরে গিয়ে জীবন্ত মাছ কিনে, ফলে মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজনীয়তা কমে এবং মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ে।
বাজারে সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও তাজা অবস্থার কারণে মাছের গড় মূল্য প্রায় ৪০০ টাকা প্রতি কিলোগ্রাম নির্ধারিত হয়েছে, যা বার্ষিক প্রায় ৭,৩০০ কোটি টাকার বাজার গঠন করে। এই মূল্য কাঠামো চাষি, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের জন্য ন্যায্যতা বজায় রাখে এবং মৎস্য শিল্পের মোট আয় বৃদ্ধি করে।
মাছ সরবরাহের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ও লোডিং-আনলোডিং কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাক চালক, লোডার, ট্যাঙ্ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী ইত্যাদি বিভিন্ন স্তরে কাজের সুযোগ বেড়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাজারে তাজা মাছের প্রবেশের ফলে রেস্টুরেন্ট ও হোটেল শিল্পেও সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে। উচ্চমানের ইলিশ, রুই ও কাতলা ইত্যাদি মাছের সরবরাহ সহজে পাওয়া যায়, যা গ্রাহকের সন্তুষ্টি বাড়িয়ে দেয় এবং খাদ্য শিল্পের মানোন্নয়নে সহায়তা করে।
তবে উৎপাদনের অতিরিক্ত পরিমাণের কারণে ভবিষ্যতে সংরক্ষণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। যদি অতিরিক্ত মাছকে দীর্ঘ দূরত্বে তাজা অবস্থায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে, তবে ফ্রিজার ও কুল চেইন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে, পরিবহন সময়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ট্যাঙ্কের চাহিদা বাড়বে, যা অতিরিক্ত মূলধন ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে। এই দিক থেকে সরকারী সহায়তা বা বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
বাজারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ শৃঙ্খলায় অতিরিক্ত ভলিউম বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে দাম হ্রাস পেলে চাষিদের আয় কমে যেতে পারে, তাই উৎপাদন ও বাজারের সমন্বয় বজায় রাখতে নীতি নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, নাটোরের মাছ ব্যবসায়ীরা এখন দেশের বিভিন্ন কোণে তাজা মাছের সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সরাসরি পুকুর থেকে ট্রাকের মাধ্যমে জীবন্ত মাছ পরিবহন, কম পরিবহন ব্যয়, কম নষ্ট হওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—all এই উপাদানগুলো মৎস্য শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। ভবিষ্যতে কুল চেইন অবকাঠামো ও বাজার সমন্বয়কে শক্তিশালী করলে তাজা মাছের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল ও লাভজনক হবে।



