উগান্ডা আজ জাতীয় স্তরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরিচালনা করেছে, যেখানে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসনরত ইউওয়েরি মুসেভেনি এবং গায়ক-রাজনীতিবিদ ববি ওয়াইন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটদান দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে সমানভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, এবং ফলাফল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। এই নির্বাচনের মূল বিষয় হল মুসেভেনির দীর্ঘমেয়াদী শাসনকে চালিয়ে যাওয়া এবং ববি ওয়াইনের পরিবর্তনমূলক প্রতিশ্রুতি।
মুসেভেনি, যিনি ১৯৮৬ সাল থেকে দেশের শীর্ষে রয়েছেন, পূর্বে ছয়টি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন এবং এখন সপ্তম মেয়াদে পুনরায় শাসন চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করছেন। ববি ওয়াইন, ৪৩ বছর বয়সী গায়ক-রাজনীতিবিদ, ২০২১ সালের নির্বাচনে মুসেভেনির পর দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও তিনি ফলাফলকে জালিয়াতি বলে খণ্ডন করেন। এইবার তিনি দুর্নীতি নির্মূল, ব্যাপক সংস্কার এবং যুবকেন্দ্রিক নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মুসেভেনি নিজেকে দেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির একমাত্র গ্যারান্টি হিসেবে উপস্থাপন করছেন, এবং তিনি জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করছেন। অন্যদিকে, ববি ওয়াইন দেশের তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, এবং তিনি অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। উভয় প্রার্থীর নীতি প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে।
নির্বাচন প্রচারাভিযান চলাকালীন বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা বাহিনী ববি ওয়াইনের সমর্থকদের ওপর আক্রমণ ও আটক করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা দপ্তরের মুখপাত্র কিটুুমা রুসোকে অভিযোগকে অস্বীকার করে, এবং তিনি বর্ণনা করেছেন যে বিরোধী দলের সমর্থকরা অশান্তি সৃষ্টি করছে।
ইন্টারনেট সেবা নির্বাচনের পূর্বে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। উগান্ডার যোগাযোগ কমিশন বলেছে, তথ্যের ভুল প্রচার, ভোটের জালিয়াতি এবং সহিংসতার উস্কানি রোধের জন্য এই ব্ল্যাকআউট প্রয়োজনীয় ছিল। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস এই পদক্ষেপকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে সমালোচনা করেছে, এবং ইন্টারনেট বন্ধের ফলে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি সীমিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
জাতীয় ঐক্য প্ল্যাটফর্ম (NUP) এই ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে, এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিরোধী দলের সংগঠন ও নির্বাচন জালিয়াতির প্রমাণ শেয়ার করা থেকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। NUP দাবি করে, ইন্টারনেট বন্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দলের প্রচার কার্যক্রমকে দমন করা, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে।
মুসেভেনি পূর্বে গেরিলা বাহিনীর নেতা ছিলেন, এবং তিনি দুইটি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বয়স ও মেয়াদ সীমা উভয়ই বাতিল করে নিজের পুনর্চয়নকে সম্ভব করেছেন। এই পরিবর্তনগুলো তাকে বহুবার পুনরায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে, এবং তার শাসনকালকে দীর্ঘায়িত করেছে। ববি ওয়াইন, যার আসল নাম রবার্ট কিয়াগুলান্যি, ২০২১ সালের নির্বাচনে ৩৫% ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও তিনি ফলাফলকে জালিয়াতি বলে খণ্ডন করেন।
এই নির্বাচনে মুসেভেনি ৫৯% এবং ববি ওয়াইন ৩৫% ভোট পেয়েছেন বলে নির্বাচনী কমিশনের প্রাথমিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যদিও ববি ওয়াইন এখনও ফলাফলকে অস্বীকার করে এবং জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। এছাড়াও, এই বছরের নির্বাচনী তালিকায় আরও ছয়জন প্রার্থী নাম নিবন্ধন করেছেন, যারা প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি, উগান্ডা পার্লামেন্টের জন্যও ৩৫৩টি আসন নির্ধারিত হয়েছে, যা নতুন আইনসভা গঠন করবে। ভোটারদের অধিকাংশই অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন, এবং কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও মৌলিক সেবার উন্নয়নকে প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছেন। দেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগই ৩০ বছরের নিচে, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুব শক্তির প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যদি মুসেভেনি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে তার শাসনকাল আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং সংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, ববি ওয়াইনের সম্ভাব্য জয় দেশের রাজনৈতিক সংস্কার, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উন্নয়নে নতুন দিকনির্দেশনা আনতে পারে। ভোটের ফলাফল উগান্ডার ভবিষ্যৎ নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামোর উপর গভীর প্রভাব ফেলবে।



