মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ জীববিজ্ঞানীরা সম্প্রতি একটি গবেষণায় প্রকাশ করেছেন যে, একে অপরের পাতা স্পর্শ করা উদ্ভিদগুলো অতিরিক্ত আলোর চাপের মুখে একা থাকা উদ্ভিদদের তুলনায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণাটি আরবিডোপসিস থ্যালিয়া (থ্যালি ক্রেস) নামের ছোট গাছকে ব্যবহার করে করা হয়েছে এবং ১২ ডিসেম্বর বায়োরেক্সিভে প্রকাশিত হয়েছে।
বনমাটির নিচে বেড়ে ওঠা গাছের জন্য ক্যানোপির ফাঁক থেকে আসা তীব্র আলোর রশ্মি প্রায়শই হুমকি স্বরূপ হয়, কারণ তা ফটোসিন্থেসিসের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং কোষীয় ক্ষতি ঘটায়। তাই উদ্ভিদগুলো কীভাবে এই ধরনের হঠাৎ চাপের পূর্বাভাস পায় তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা গাছগুলোকে দুইটি গ্রুপে ভাগ করে চাষ করেন: একটি গ্রুপে গাছগুলো একাকীভাবে রাখা হয়, আর অন্য গ্রুপে গাছগুলো ঘনভাবে বসে একে অপরের পাতায় স্পর্শ করতে পারে। উভয় গ্রুপকে একই সময়ে তীব্র আলোতে প্রকাশ করা হয়।
ফলাফল দেখায় যে, একা থাকা গাছগুলোতে পাতা পুড়ে যাওয়া, ক্লোরোফিলের হ্রাস এবং কোষের গঠনগত পরিবর্তনের চিহ্ন বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, স্পর্শে থাকা গাছগুলোতে এই ধরনের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং তারা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
গবেষকরা এই ঘটনাকে “এক ধরনের সতর্কতা সংকেত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে স্পর্শের মাধ্যমে গাছগুলো একে অপরকে আসন্ন চাপের জন্য প্রস্তুত করে।
উদ্ভিদ যোগাযোগের প্রচলিত পথগুলো মূলত মাটির মাধ্যমে, মাইকরাইজা ফাঙ্গি নেটওয়ার্ক বা বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও সাম্প্রতিক গবেষণায় শোনা যায় যে, গাছগুলো শব্দের মাধ্যমে স্ট্রেসের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।
এই গবেষণায় নতুনভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে, পাতার স্পর্শের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেতও গাছের মধ্যে প্রেরিত হতে পারে, যা পূর্বে অজানা ছিল।
গাছের জিন প্রকাশের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একা থাকা গাছের তুলনায় স্পর্শে থাকা গাছগুলোতে স্ট্রেস-প্রতিরোধী জিনের সক্রিয়তা বেশি। এই জিনগুলো প্রোটিন উৎপাদন বাড়িয়ে গাছকে আলোজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
গাছের পাতার মধ্যে প্রেরিত সংকেতগুলো রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে স্পর্শের এক ঘণ্টা পরই বৈদ্যুতিক তরঙ্গের বৃদ্ধি রেকর্ড করা যায়। এই দ্রুত সংকেত গাছকে তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত অবস্থায় নিয়ে যায়।
বৈদ্যুতিক সংকেতের পাশাপাশি, গবেষকরা রাসায়নিক সিগন্যালের ভূমিকা নির্ণয়ের জন্য জিনগতভাবে পরিবর্তিত গাছ ব্যবহার করেন, যেগুলো নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রেরণ করতে অক্ষম। এই গাছগুলোতে স্পর্শের ফলে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া কম স্পষ্ট হয়, যা ইঙ্গিত দেয় যে রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক উভয় সিগন্যালই গুরুত্বপূর্ণ।
এক ঘণ্টা স্পর্শের পর গাছের পাতা থেকে নির্দিষ্ট ইলেকট্রিক পটেনশিয়াল পরিবর্তন এবং জিন সক্রিয়তা দেখা যায়, যা দ্রুত স্ট্রেসের জন্য প্রস্তুতি নির্দেশ করে।
এই ফলাফলগুলো দেখায় যে, শারীরিক সংস্পর্শ কেবল মাটির নেটওয়ার্কের পরিপূরক নয়, বরং উপরের অংশেও উদ্ভিদকে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের জন্য দ্রুত অভিযোজিত করতে পারে।
গবেষণার শেষ পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি কৃষিকাজে প্রয়োগ করা হলে ফসলের স্ট্রেস সহনশীলতা বাড়তে পারে। পাঠকরা কি মনে করেন, ঘনভাবে চাষ করা ফসলগুলো স্বাভাবিকভাবে এই ধরনের সংবেদনশীলতা অর্জন করতে পারে? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



