বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহে ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তার চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান দ্বারা ১০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি প্রেরণ করা হয়। চিঠিতে এলপিজি আমদানি অনুমোদনের অনুরোধ করা হয়েছে এবং বর্তমান বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার এলপিজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজন হলে বিপিসিকে অনুমোদন দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপ বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে।
বিপিসি উল্লেখ করেছে, দেশের বর্তমান এলপিজি সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল এবং সরকারি সংস্থা বা বিপিসি নিজে থেকে সরাসরি আমদানি করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো অপ্রত্যাশিত সংকটের সময় দ্রুত হস্তক্ষেপের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দেশের চাহিদার প্রায় ১.৩৩ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। তবে বিপিসি স্বীকার করেছে, তার নিজস্ব পর্যায়ে এলপিজি সংরক্ষণ ও খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যেমন জেটি-ভিত্তিক পাইপলাইন, ফ্লোমিটার এবং স্টোরেজ ট্যাংক, বর্তমানে অনুপস্থিত।
এই অবকাঠামোগত ঘাটতি মোকাবেলায় বিপিসি কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র অঞ্চলে বেসরকারি অপারেটরদের ব্যবহার করা লাইটারিং পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে আগ্রহী অপারেটররা লাইটার জাহাজের মাধ্যমে এলপিজি খালাস ও বিতরণ করতে পারে, যা সরবরাহের অস্থায়ী ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
বিপিসি চিঠিতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) এর সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে, সম্ভাব্য অংশীদারিত্বের মাধ্যমে লাইটার জাহাজের ব্যবহার ও লজিস্টিক্স সমন্বয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল বাজারে অপ্রয়োজনীয় মূল্য উত্থান রোধ করা এবং ভোক্তাদের স্বাভাবিক দামের কাছাকাছি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বাজারে এলপিজি দামের তীব্র বৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদন হয়েছে। ভোক্তারা স্বাভাবিক দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। বিপিসি এই পরিস্থিতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকে, এলপিজি আমদানি অনুমোদন দিলে বেসরকারি সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে এবং মূল্য স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, বিপিসির অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গৃহীত হলে ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরবরাহের ঘাটতি মোকাবেলা করা যাবে।
এ পর্যন্ত, বিপিসি উল্লেখ করেছে যে তার নিজস্ব সংরক্ষণ ও খালাস সুবিধা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এখনও অনুপস্থিত। এই ঘাটতি পূরণে সরকারী তহবিল বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
বিপিসি এবং জ্বালানি উপদেষ্টার মন্তব্য অনুসারে, যদি সরকার এলপিজি আমদানি অনুমোদন করে, তবে তা স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্য হ্রাসে সহায়তা করবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ সংকট এড়ানো যায়।
বিপিসি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, লাইটারিং পদ্ধতি ব্যবহারকারী অপারেটরদের জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই দিক থেকে সরকারী তত্ত্বাবধান ও নিয়মাবলী প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে অপারেশন চলাকালীন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
সারসংক্ষেপে, এলপিজি সরবরাহের ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মোকাবেলায় সরকার ও বিপিসি দুজনেই সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, বাজারে স্বল্পমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংসম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে।



