পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর ব্যয় মাত্র বরাদ্দের ১৭.৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ। এই হার পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম এবং গত তিনটি অর্থবছরের প্রথমার্ধের গড়ের থেকেও নিচে।
বিশেষ করে, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এডিপি ব্যয় ১৭.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে তা ১৭.৯৭ শতাংশ ছিল। অতীতের তিনটি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাস্তবায়নের হার যথাক্রমে ২২.৪৮ (২০২৩-২৪), ২৩.৫৩ (২০২২-২৩) এবং ২৪.০৬ শতাংশ (২০২১-২২) রেকর্ড করেছে।
একক মাসের দৃষ্টিতে বাস্তবায়নের হার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে; ডিসেম্বর মাসে ব্যয় ৫.৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের ৫.৬৭ শতাংশের তুলনায় বেশি। তবে জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে মোট ব্যয় ৪১,৮৭৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ৫০,০২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সরকারের সংশোধিত এডিপি থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকার বড় কাটছাঁট করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ১৩.০৪ শতাংশের সমান। জুলাই ২০২৪-এ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুনে তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিগুলোকে হ্রাস করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২,৩০,০০০ কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। কাটছাঁটের পর, জানুয়ারি পর্যন্ত সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) এর মোট আকার ২ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কাটছাঁটের সবচেয়ে বড় প্রভাব স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, আর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে ৫৫ শতাংশ কমে গেছে। সোমবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এই সংশোধিত এডিপি অনুমোদন করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত ও বিরোধী দলগুলো এই কাটছাঁটকে সমালোচনা করেছে, তারা যুক্তি দিয়েছে যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে এত বড় হ্রাস জনসাধারণের মৌলিক সেবা ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে। তারা দাবি করে যে, সরকারকে আর্থিক সংকটের মুখে হলেও মৌলিক সেবার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, অর্থবছরের শুরুর দিকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কম থাকে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়ে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ফলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, কারফিউ জারি এবং সম্পূর্ণ শাটডাউনের মতো ঘটনা ঘটায়, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর করে দেয়। এই পরিস্থিতি সরকারকে আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট সরকারকে জনমত সংগ্রহে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে, আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে এই বিষয়গুলোকে বিরোধী দলগুলো ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে পারে। সরকার যদি পরবর্তী ত্রৈমাসিকে ব্যয় বাড়াতে না পারে, তবে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি এবং মৌলিক সেবার ঘাটতি রাজনৈতিক বিরোধিতা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, সরকার দাবি করে যে, বাজেটের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এই কাটছাঁট অপরিহার্য ছিল। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, পরবর্তী ত্রৈমাসিকে ব্যয় বাড়ানোর জন্য নতুন তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গতি পুনরুদ্ধার করা হবে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এডিপি বাস্তবায়নের হার ১৭.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁটের ফলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে, এবং এই বিষয়গুলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।



