ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি একটি সমন্বিত অভিযান চালিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উৎপাদিত বিশাল পরিমাণে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে। এই দাবি দেশের চলমান অস্থিরতা ও প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে, যেখানে সরকার ভিন্নমত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
অভিযানটি দেশজুড়ে একাধিক বাড়ি ও গুদাম ঘেঁষে সম্পন্ন হয়, যেখানে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে তারা বিস্তৃত পরিসরে গোপনভাবে সংরক্ষিত সামগ্রী আবিষ্কার করেছে। জব্দকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় এবং অস্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, বিভিন্ন ধরণের গোলাবারুদ এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি শক্তিশালী আইইডি (বিস্ফোরক ডিভাইস)।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই বিস্ফোরকগুলো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং সংবেদনশীল এলাকায় লুকিয়ে রাখা ছিল, যা সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করা হতে পারত। গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করে যে এই সামগ্রীগুলো বিদেশি শক্তির সরাসরি সমর্থন নিয়ে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে উল্লেখ করেন যে, বিদেশি কণ্ঠস্বরের অডিও রেকর্ডিং কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিবাদকারীদের উস্কানি ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এই রেকর্ডিংগুলোতে স্পষ্টভাবে বিদেশি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা সরকারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ তোলার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে যে তারা বিশেষ এজেন্ট পাঠিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই এজেন্টরা পরিকল্পিতভাবে প্রতিবাদকে উস্কে দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করতে চায়।
ইরান সরকার এই অভিযোগের পক্ষে যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে যে, সাম্প্রতিক মাসে দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদে সশস্ত্র হিংসা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিদেশি হস্তক্ষেপের সূচক হতে পারে। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থেকে সরাসরি কোনো প্রত্যাখ্যানের প্রকাশ না থাকলেও, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই দাবিগুলোকে অস্বীকারের স্বর শোনা যায়।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, ইরানের এই ধরনের প্রকাশনা তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “বহিরাগত হুমকির রূপকথা সরকারকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে জনমত সমর্থন পেতে সাহায্য করে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে।” এই মন্তব্যটি ইরানের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রেক্ষাপটে রাখে।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই অভিযোগগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা, বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তি ও স্যানে অঞ্চলের সশস্ত্র সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে, এই নতুন অভিযোগকে তীব্রতর করে তুলতে পারে।
ইরান সম্ভবত এই বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলে ধরতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন করা যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়ানো যায়। একই সঙ্গে, দেশীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্রতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত নজরদারি ও সম্ভাব্য গ্রেপ্তার বাড়াতে পারে।
এই ঘটনার পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, ইরান সরকার সম্ভবত বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে অডিও রেকর্ডিংগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ করবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক নোটিশ জারি করতে পারে। এছাড়া, পারস্পরিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন এবং সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো পুনরায় চালু হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার এই বড় আকারের অস্ত্র ও বিস্ফোরক জব্দের দাবি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা গতিবিদ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবিষ্যতে এই দাবিগুলোর সত্যতা ও প্রভাব কীভাবে বিকশিত হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ দাবি করবে।



