ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ইরানে অবস্থানরত সব ভারতীয় নাগরিককে দ্রুত দেশ ত্যাগের জরুরি নির্দেশ জারি করেছে। এই সিদ্ধান্তটি ইরানের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা অস্থিরতা ও সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় নাগরিকদের নিরাপদে প্রস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী, তীর্থযাত্রী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকসহ ইরানে বসবাসকারী বা ভ্রমণরত সকল ভারতীয়কে উপলব্ধ যেকোনো পরিবহন মাধ্যম, বিশেষত বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহার করে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে আসতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী স্পষ্ট নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানে কোনো ধরনের ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার কঠোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দূতাবাসের এই নির্দেশনা পূর্বে ৫ জানুয়ারি জারি করা সতর্কবার্তার ধারাবাহিকতা, যেখানে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে, এখন সকল নাগরিককে সক্রিয়ভাবে প্রস্থান পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য হিংসাত্মক প্রতিবাদ বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে না পড়তে হয়।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের ফলে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
দূতাবাসের নির্দেশনা অনুসারে, সকল ভারতীয়কে পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সঙ্গে রাখতে হবে। জরুরি সহায়তার জন্য একাধিক হেল্পলাইন নম্বর এবং একটি সরকারি ই-মেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়। এছাড়া, এখনও নিবন্ধন না করা নাগরিকদেরকে মন্ত্রণালয়ের অনলাইন নিবন্ধন পোর্টালে দ্রুত নাম নথিভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট এবং ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধী প্রতিবাদগুলো সাম্প্রতিক সপ্তাহে তীব্রতর হয়েছে, যা বহু শহরে সহিংসতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল স্থানীয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বহু দেশই তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমান ধরনের সতর্কতা জারি করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ইরানের অস্থিরতা সাম্প্রতিক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে, এবং ভারতীয় নাগরিকদের প্রস্থান নির্দেশনা এই জটিলতা মোকাবেলায় একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশও তাদের নাগরিকদের জন্য অনুরূপ প্রস্থান নির্দেশনা জারি করেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির ব্যাপক স্বীকৃতি নির্দেশ করে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদক্ষেপটি ভারত-ইরান সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদিও দুই দেশ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছে, তবে নাগরিক সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ভবিষ্যতে যদি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়, তবে ভারত সরকার অতিরিক্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে, যেমন ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ানো বা তহবিল সহায়তা প্রদান।
দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানে চলমান প্রতিবাদ ও সহিংসতার তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং নতুন কোনো উন্নয়ন ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে নাগরিকদের জানানো হবে। তাই, ভারতীয় নাগরিকদেরকে দূতাবাসের নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপদ রুট নির্বাচন করা এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা জরুরি।
এই প্রস্থান নির্দেশনা ইরানের অস্থিরতা মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি অংশ, এবং এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের উপর।



