বেনাপোল স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার রাতেই একটি মাছের চালান আটকে রাখে। চালানটি মূলত সাদা মাছের হিসেবে ঘোষিত হলেও, কায়িক পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে তিন টন ভারতীয় ইলিশ পাওয়া যায়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ত্রিশ লাখ টাকার কাছাকাছি।
কাস্টমসের ৩১ নম্বর কাঁচামালের শেডে চালানটি আটক করা হয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শেডে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘোষণাপত্রে ‘সুইট ফিস’ বোয়াল, ফলিও ও বাঘাড় মাছ উল্লেখ থাকলেও, ২২৫ প্যাকেজের মধ্যে মাত্র ৫৪ প্যাকেজে ইলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
ইলিশের মোট ওজন প্রায় সাড়ে তিন টন, যা ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত সাদা মাছের তুলনায় স্পষ্টভাবে ভিন্ন। এই পার্থক্যের ফলে পুরো চালানটি অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করা হয়। অন্যান্য পচনশীল পণ্য, যেগুলো ঘোষণাপত্রে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেগুলোকে খালাসের ব্যবস্থা করা হয়।
চালানটির ভারতীয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আরজে ইন্টারন্যাশনাল’ এবং বাংলাদেশের আমদানিকারক ‘সাতক্ষীরার মেসার্স জান্নাত এন্টারপ্রাইজ’। উভয় পক্ষের সমন্বয়ে ঘোষণাপত্রে পণ্যের প্রকৃতি গোপন রেখে, উচ্চমূল্যের ও নিয়ন্ত্রিত ইলিশকে কম শুল্কে খালাসের চেষ্টা করা হয়েছে বলে কাস্টমস জানায়।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান উল্লেখ করেন, “ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্টভাবে অমিল রয়েছে, যা শুল্ক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, আমদানিকারক, সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
ফাইজুর রহমান জানান, “কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি এই ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকে, তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা কঠোরভাবে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না।”
কাস্টমসের অনুসন্ধান চলমান থাকায়, সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে শুল্ক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে, চালানটি জব্দের পর রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের বিরুদ্ধে শুল্ক ও জরিমানা আরোপের পাশাপাশি, অপরাধমূলক দায়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুল্ক আইন অনুসারে, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে কম শুল্কে পণ্য খালাসের প্রচেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ক্ষেত্রে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্যাকেজিং সংগ্রহ করেছে। ভবিষ্যতে, আদালতে এই বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি নির্ধারণের জন্য প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইলিশ বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান মাছ, যা রপ্তানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায়। তাই, মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্ক কমানোর প্রচেষ্টা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বাজারের স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার নীতিকেও ক্ষুণ্ন করে।
কাস্টমসের এই পদক্ষেপের পর, অন্যান্য বন্দর ও শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছেও সতর্কতা বাড়বে বলে আশা করা যায়। শুল্ক দায়িত্বশীলদের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং অনিয়মের শিকার না হতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কঠোর শাসন প্রয়োজন।
এই ঘটনার পর, সংশ্লিষ্ট উভয় সংস্থা—মেসার্স আরজে ইন্টারন্যাশনাল এবং জান্নাত এন্টারপ্রাইজ—কে শুল্ক দপ্তরের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে তাদেরকে সকল প্রাসঙ্গিক নথি, প্যাকেজিং রেকর্ড এবং পণ্যের উত্স সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
শুল্ক দপ্তর জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অনুরূপ মিথ্যা ঘোষণার ঘটনা রোধে কাস্টমসের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। এতে কায়িক পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের পূর্ব অনুমোদন প্রক্রিয়া কঠোর করা এবং শুল্ক দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সর্বশেষে, কমিশনার ফাইজুর রহমান উল্লেখ করেন, “শুল্ক আইন লঙ্ঘনকারী যেকোনো সংস্থা বা ব্যক্তি যদি দায়িত্বশীলভাবে কাজ না করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দেশের আর্থিক স্বার্থ রক্ষার জন্য এই ধরনের অনিয়মের কোনো জায়গা নেই।”



