বিশ্বব্যাংক ২০২৪ জানুয়ারি প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাসে জানিয়েছে যে, বর্তমান অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৪.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। একই প্রতিবেদনে পরের অর্থবছর (২০২৬-২৭) এই হার ৬.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, ভোক্তা ব্যয়ের পরিমাণ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কমে যাবে। এই প্রবণতা মূলত গৃহস্থালী খরচের পুনরুজ্জীবন এবং রপ্তানি বাজারের স্থিতিশীলতা থেকে উদ্ভূত।
তবে, বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুসারে, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমানের উপরে রয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি কঠোর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। এই নীতি পরিবর্তন স্বল্পমেয়াদে ঋণগ্রহণের খরচ বাড়িয়ে ব্যবসায়িক বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বৈশ্বিক আর্থিক প্রবাহে হ্রাসের ফলে বাংলাদেশের ঋণপ্রবাহ কমে গেছে, যা বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণে বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষত, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ক্রেডিটের প্রাপ্যতা সীমিত হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক ভুটানকে চিহ্নিত করেছে, যেখানে ৭.৩ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরের স্থানে রয়েছে ভারত, যার অর্থবছরে ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি বৃদ্ধির অস্থায়ী হিসাব প্রকাশ করেছে। এই সময়ে দেশের অর্থবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছর (২০২৪-২৫) একই সময়ে ২.৫৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
প্রথম প্রান্তিকের এই গতি ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি শিল্পের পুনরুজ্জীবনকে প্রতিফলিত করে। বিশেষত, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরে অর্ডার পুনরায় বাড়ার ফলে উৎপাদন বাড়ছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিতে, পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালে এই হার ২.৬ শতাংশে নেমে আসবে এবং ২০২৭ সালে ২.৭ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতি ২০২৬ সালে ২.৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই হ্রাস মূলত শ্রমবাজারের চাপ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি দামের হ্রাসের ফলে ঘটবে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ক্রেডিটের সংকট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্য। মুদ্রানীতি কঠোর হওয়ায় ঋণগ্রহণের খরচ বাড়লে বিনিয়োগের গতি ধীর হতে পারে, যা উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী বাংলাদেশের জিডিপি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪.৬ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬.১ শতাংশে পৌঁছাবে। ভোক্তা ব্যয় বাড়া এবং মুদ্রাস্ফীতি কমার সম্ভাবনা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করলেও, ক্রেডিট প্রবাহের হ্রাস এবং মুদ্রানীতি কঠোরতা ব্যবসায়িক পরিবেশে সতর্কতা বজায় রাখবে। এই পরিস্থিতিতে নীতি নির্ধারকদের উচিত আর্থিক শর্তসাপেক্ষে সমন্বয় সাধন করে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।



