অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (ACC) আজ ঢাকার ইন্টিগ্রেটেড জেলা অফিসে ১২টি পৃথক মামলায় মোট ৩৫জনের বিরুদ্ধে জাল ঋণ গ্রহণের অভিযোগ আনছে। মামলাগুলোতে প্রাক্তন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রাশান্ত কুমার হালদার (PK হালদার) সহ আর্থিক খাতে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের মূল বিষয় হল ১২টি শেল ও কাগজের কোম্পানির নামে ৪৩৩.৯৬ কোটি টাকার ভুয়া ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাৎ করা।
মামলাগুলো ACC-র উপ-নির্দেশক মো. মাশিরুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক মো. ইমরান আকন কর্তৃক দাখিল করা হয়েছে। দাখিলের সময় উভয় কর্মকর্তাই উল্লেখ করেছেন যে, অভিযুক্তরা ঋণ গ্রহণের সময় কৃত্রিমভাবে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম ব্যবহার করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পেয়েছেন।
অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান, ব্যবসায়ী মহফুজা রহমান বেবি, মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ এবং আবদুল মোটালিব আহমেদসহ আরও তেরজনের নাম। এ সকল ব্যক্তি একত্রে শেল কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা গড়ে তোলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, শেল কোম্পানিগুলোর নামে ঋণ অ্যাকাউন্ট খুলে প্রথমে এক বা দুই কিস্তি পরিশোধ করা হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো কিস্তি পরিশোধ করা হয় না। তবুও, ঋণ পুনর্নির্ধারণের জন্য বোর্ড মিটিংয়ে কোনো আপত্তি না উত্থাপন করে ঋণ পুনরায় চালু করা হয়, যা অভিযুক্তদের প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
ACC আরও জানিয়েছে যে, ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে ব্যবসার অস্তিত্বের ভান করা হয়েছে। এই নথিপত্রে এমন তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল যা বাস্তবে কোনো কার্যকরী ব্যবসা বা উৎপাদন দেখায় না। ফলে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই কল্পিত কোম্পানিগুলোকে ঋণ প্রদান করা হয়।
তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, শেল কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা বাস্তবে অস্তিত্বহীন। সংশ্লিষ্ট স্থানে কোনো অফিস, কর্মী বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এই বিষয়টি ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
মামলায় উল্লেখিত ৪৩৩.৯৬ কোটি টাকার পরিমাণ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ACC এই অর্থের পুনরুদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট সম্পদের জব্দের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি ব্যবস্থা অনুযায়ী, পরবর্তী আদালত শুনানির তারিখ শীঘ্রই নির্ধারিত হবে। সংশ্লিষ্ট আদালত মামলাগুলোকে একত্রে শুনবে এবং প্রতিটি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করবে।
ACC-র কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, এই মামলাগুলো আর্থিক সেক্টরে জালিয়াতি রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। একই সঙ্গে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ অনুমোদনের সময় কঠোর ডিউ ডিলিজেন্স প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে জালিয়াতি, আত্মসাৎ এবং নথিপত্রের ভুয়া তৈরি। আদালত যদি দোষী সাব্যস্ত করে, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানা ভোগ করতে পারেন।
এই মামলায় জড়িত সকল পক্ষকে আইনগত প্রক্রিয়ার পূর্ণতা পর্যন্ত সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে, জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে যে, শেল কোম্পানির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
ACC-র এই পদক্ষেপ দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে, এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ জালিয়াতি রোধে প্রয়োজনীয় নীতি ও নিয়মাবলী শক্তিশালী করার দিকেও ইঙ্গিত দেবে।



