দ্যাবি, ঢাকা – জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের ৩২৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দু’টি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা—DGFI ও NSI—এর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে জয়ী করতে কাজ করেছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা নির্বাচনের নকশা, পরিকল্পনা ও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। কমিশনের মতে, এই হস্তক্ষেপের ফলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন ২০২৪ সালের শেষের দিকে গঠিত হয়, যার প্রধান কাজ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত করা। এই কমিটি সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন নেতৃত্বে কাজ করেছে এবং তার প্রতিবেদন সরকার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ রূপ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, DGFI ও NSI-র শীর্ষ কর্মকর্তারা নির্বাচনের সামগ্রিক কৌশল গঠন ও তদারকি করার জন্য একত্রে কাজ করেছেন। তারা কেবল নীতি নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ না থেকে, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের আঞ্চলিক অফিসের পরিচালক, যুগ্ম পরিচালকসহ নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিকল্পনা মাঠে বাস্তবায়ন করেছেন।
কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের থেকে প্রশাসনের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফলে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচনী সংস্থার কিছু অংশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থা নির্বাচনের ন্যায়সঙ্গত পরিচালনা নিশ্চিত করার বদলে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ফলাফল নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের সময়কালে DGFI ও NSI-র কর্মীরা গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ, ভোটার তালিকা পরিবর্তন এবং ভোটারদের উপর চাপ প্রয়োগের মতো কাজেও যুক্ত ছিলেন। এসব কাজের ফলে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে।
কমিশন সকল ধরনের নির্বাচনী কাজে গোয়েন্দা সংস্থার অংশগ্রহণ বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। তবে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, তবে তা পৃথক বিধান অনুযায়ী সীমাবদ্ধ থাকবে বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নির্বাচন পরিচালনায় গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা সীমিত করা হবে বলে আশা করা যায়।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, নির্বাচন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়া যাবে, এবং তা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে থাকবে। এই ধারা নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বিপক্ষের দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি, এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা দাবি করে, গোয়েন্দা সংস্থার স্বপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মৌলিক ন্যায়পরায়ণতা নষ্ট করেছে এবং ভবিষ্যতে এমন হস্তক্ষেপ রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারী পক্ষের মন্তব্যে বলা হয়েছে, নির্বাচন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা প্রয়োজনীয় হতে পারে, তবে তাদের ভূমিকা সীমিত করার বিষয়ে কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করা হবে। সরকার উল্লেখ করেছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই প্রতিবেদন যদি সংসদে অনুমোদিত হয়, তবে আগামী নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা সংস্থার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপিত হতে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রচার ও সংগঠন কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে, এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ সংস্থার ভূমিকা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন শেষ তিন নির্বাচনে গোয়েন্দা সংস্থার স্বপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ তুলে ধরে, এবং ভবিষ্যতে এমন হস্তক্ষেপ রোধে সংস্থার ভূমিকা সীমিত করার সুপারিশ করে। এই সুপারিশের বাস্তবায়ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।



