রাজশাহীর পাঁচটি উপজেলায় ঋণগ্রস্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে ঋণ চক্রে আটকে গিয়ে আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোরের মোট ২৪টি পরিবারে একাধিক ঋণ গ্রহণের পর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা দেখা দেয়, যার ফলে গত বছর ১৬ এপ্রিল থেকে ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আটজনের মৃত্যু ঘটেছে।
প্রতিটি পরিবার একাধিক ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছিল। বাঘা, চারঘাট, মোহনপুর ও তানোরের ১৬টি পরিবার ব্যবসা শুরু বা চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছিল, আর চারটি পরিবার ফসল চাষের জন্য ঋণ নিয়েছিল। বাকি পরিবারগুলো সন্তানবিয়ে, বিদেশে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পারিবারিক জরুরি কাজের জন্য ঋণ নিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহণের পর জুয়া খেলার জন্যও অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঋণ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা পরিবারগুলোকে আর্থিক দায়ের ভারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। গত বছরের গ্রীষ্মকালে চারটি পরিবারে মোট আটজনের মৃত্যু ঘটেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চারজন আত্মহত্যা করেছেন, আর একটি ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেন। মৃতদের পরিবার ও স্থানীয় পুলিশ উভয়েই এই ঘটনাকে ঋণদাতাদের ‘টার্গেট ঋণ’ নীতির ফলাফল বলে উল্লেখ করেছে।
রাজশাহীর বেসরকারি সংস্থা রুরাল আন্ডার প্রিভিলাইজড অ্যান্ড ল্যান্ডলেস ফারমার্স অর্গানাইজেশন (রুলফাও) এর পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, লক্ষ্যঋণ প্রদান করার সময় এনজিও কর্মীরা সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি টেস্ট) না করে ঋণ দিচ্ছেন। তিনি আরও জানান, একই ঋণগ্রহীতা একাধিক এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণের ফলে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে ফেলেছে।
শাপলা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা, যা রাজশাহীতে ঋণদানকারী অন্যতম সংস্থা, তার সহকারী পরিচালক (এইচআর ও অ্যাডমিন) জাহাঙ্গীর আলম উল্লেখ করেন যে, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) সম্পূর্ণ কার্যকর হলে একই গ্রাহকের একাধিক ঋণ সংক্রান্ত তথ্য একসাথে যাচাই করা সম্ভব হবে এবং ঋণ চক্রের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে। তিনি বলেন, সিআইবি প্রতিষ্ঠার পর গ্রাহকের আইডি কার্ডের মাধ্যমে তার আর কোনো সংস্থা বা ব্যাংকে ঋণ আছে কি না তা দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় পুলিশ বর্তমানে মৃতদের পরিবার থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও ঋণদাতা সংস্থার রেকর্ড পর্যালোচনা করছে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, ঋণগ্রহীতারা ঋণ গ্রহণের সময় যথাযথ আর্থিক পরিকল্পনা না করে দ্রুত ঋণ গ্রহণের ফলে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া, কিছু ঋণদাতা সংস্থা ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট ইতিহাস যাচাই না করে ঋণ প্রদান করেছে, যা ঋণ চক্রের গঠনকে ত্বরান্বিত করেছে।
অধিকন্তু, ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে জুয়া খেলার জন্য ঋণ ব্যবহার করার ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে। এই ধরনের অবৈধ ব্যবহার ঋণ পরিশোধে বাধা সৃষ্টি করে এবং পরিবারকে আর্থিক দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ঋণ চক্রের সমস্যার সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ঋণদাতা সংস্থাগুলোকে ঋণ প্রদানের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
সিআইবি চালু হওয়ার পর ঋণগ্রহীতার একাধিক ঋণ একত্রে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে সিআইবি সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়ায় ঋণদাতা সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে ঋণ প্রদান করে চলেছে, যা ঋণ চক্রের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে।
এই ঘটনাগুলো ঋণগ্রহীতার জীবনে যে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে তা স্পষ্ট করে তুলেছে। পরিবারগুলো আর্থিক দায়ের ভারে আত্মহত্যা বা অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক নীতি প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ক্রেডিট যাচাই এবং ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন।



