দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বুধবার সেগুনবাগিচা সদর দফতরে সাবেক কমিশনার মো. জহুরুল হককে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অভিযোগের মূল বিষয় হল তিনি ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’, ‘ঘুষ গ্রহণ’ ও ‘জালিয়াতি’সহ বিভিন্ন আর্থিক অপরাধে জড়িত ছিলেন। জহুরুল হক তার স্ত্রীসহ সকাল ১০:৩০ টার দিকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হন এবং দুপুর ১:৩০ টার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অফিস ত্যাগ করেন। ত্যাগের সময় কোনো সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেননি।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জহুরুল হকের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানালেও তদন্তের বিশদ প্রকাশে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জহুরুল হকের বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে তদন্তাধীন মামলার আসামিদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, রাজউকের প্লট বরাদ্দের জন্য জালিয়াতি, দুইটি বড় টেলিকম অপারেটর থেকে বিশাল পরিমাণে ঘুষ গ্রহণ এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচার করে সম্পদ সঞ্চয় করার অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের তদন্তের জন্য দুদক গত বছরের জানুয়ারি একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে। দলটির নেতৃত্বে দুদকের পরিচালক এস.এম.এম. আখতার হামিদ ভূঞা আছেন, সঙ্গে সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম এবং উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন রয়েছেন। দলটি অভিযোগের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগের পূর্বে, ৩ ডিসেম্বর দুদক জহুরুল হকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের টার্মিনেশন রেট ও রেভিনিউ শেয়ার অনিয়মিতভাবে কমিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় উল্লেখিত আর্থিক ক্ষতি দেশের টেলিকম সেক্টরের আয়কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে বলে সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জহুরুল হকের পাসপোর্ট বাতিল করে তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে তিনি বিদেশে কোনো ভ্রমণ বা ব্যবসা করতে পারবেন না, যা তার আর্থিক লেনদেনের উপর অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
জহুরুল হক পূর্বে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিডিআর (বিডিআর) হত্যামামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ সালে তিনি অবসরে যান। পরে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে বিটিআরসির কমিশনার এবং পরে চেয়ারম্যানের পদে নিয়োগ দেয়।
তিনি ১০ মার্চ ২০২১ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনে কমিশনারের পদে যোগ দেন। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৩০ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর দুদক তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তকে ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমানে দুদকের অনুসন্ধান দল জহুরুল হকের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড, বিদেশি সম্পদের সূত্র এবং টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগের নথি বিশ্লেষণ করছে। দলটি দাবি করে যে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, জহুরুল হকের বিরুদ্ধে গৃহীত অভিযোগগুলো বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয়। ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’, ‘ঘুষ গ্রহণ’ এবং ‘জালিয়াতি’ সংক্রান্ত আইনের অধীনে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পদ জব্দের সম্ভাবনা রয়েছে।
দুদকের এই তদন্তের ফলাফল ও আদালতের রায়ের অপেক্ষা এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রমাণ যথেষ্ট প্রমাণিত হয়, তবে জহুরুল হকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



