বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শেষ তিন বছর (২০২১‑২০২৩) গ্লোবাল গড় তাপমাত্রা ঐতিহাসিক রেকর্ডে সর্বোচ্চ স্তরে রেকর্ড হয়েছে। এই সময়ে গড় তাপমাত্রা প্রাক‑শিল্পিক স্তর থেকে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা পূর্বের কোনো ত্রৈমাসিকের চেয়ে উঁচু।
ডেটা সংগ্রহের প্রধান সূত্র হিসেবে ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) এবং নাসার গ্লোবাল ক্লাইমেট অবজারভেটরি (GISS) উল্লেখ করা হয়। উভয় সংস্থা একই সময়সীমায় একই ধরণের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখিয়েছে, ফলে ফলাফলগুলো পরস্পরকে সমর্থন করে।
গ্লোবাল গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি মূলত ভূমি ও সমুদ্রের পৃষ্ঠে রেকর্ড করা তাপমাত্রা থেকে নির্ণয় করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর প্রায় ০.১‑০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অতিরিক্ত উষ্ণতা যুক্ত হয়েছে, যা পূর্বের দশকের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে।
এই তাপমাত্রা শীর্ষে পৌঁছানোর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশে ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে তাপপ্রবাহের সময়কালও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে। গ্লোবাল সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা প্রাক‑শিল্পিক স্তর থেকে প্রায় ০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, যা সমুদ্রের স্তর বাড়ার এবং প্রবালপ্রাচীরের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চ তাপমাত্রা সমুদ্রের স্তরে সরাসরি প্রভাব ফেলছে; গড়ে প্রতি বছর সমুদ্রের স্তর প্রায় ৩.৩ মিমি বাড়ছে। এই প্রবণতা নিম্নভূমি দেশ এবং দ্বীপপুঞ্জের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে বন্যা এবং ভূমি ক্ষয় বাড়তে পারে।
বরফের গলন হারও তীব্রতর হয়েছে। আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের বরফের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার ফলে সমুদ্রের লবণাক্ততা এবং প্রবাহের প্যাটার্নে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
কৃষি ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফসলের উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। গরমের সময়কাল বাড়ার ফলে ধান, গম এবং ভুট্টার মতো প্রধান ফসলের ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকরা এই পরিবর্তনের মুখোমুখি।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। তাপজনিত রোগ, যেমন হিট স্ট্রোক এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে বয়স্ক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
বিজ্ঞানীরা একমত যে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণে মূলত চালিত। কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং মিথেনের ঘনত্বের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বায়ুমণ্ডলের তাপধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ত্বরান্বিত হয়েছে।
পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, ব্যক্তিগত স্তরে জ্বালানি সাশ্রয়, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার এবং টেকসই ভ্রমণ পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে গ্রীনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারী নীতি ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সমর্থনও জরুরি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ধীর করা যায়।
আপনার পরিবার ও সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে, আজই পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গ্রহণের জন্য ছোট পদক্ষেপ নিন এবং স্থানীয় ও জাতীয় স্তরে জলবায়ু নীতি সমর্থন করুন।



